প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দল না ব্যক্তি?

টিম স্টিল : প্রথমবার বাংলাদেশ এসেছিলাম লন্ডনের কিছু বাংলাদেশি বন্ধুর ব্যবস্থাপনায়। যারা ছিলো নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত কয়েকজন আওয়ামী লীগ সমর্থক। তাঁরা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে লেবার পার্টির বাংলাদেশি সংস্করণ। নব্বই দশকের শেষ ভাগের কথা। ততদিনে ব্রিটিশ লেবার পার্টির সঙ্গে আমার সম্পর্ক তিরিশ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচনে দাঁড়ানোসহ, স্থানীয় পর্যায়ে (পড়হংঃরঃঁবহপু ষবাবষ) দলটির সব রকম পদেই ততদিনে আমার কাজের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। নেইল কিনকের অধীনে কাজ করার সময় একবার আমাকে বলা হয়েছিলো, দলকে ‘আধুনিকায়ন’-এর জন্য একটা ছোট গ্রুপ তৈরিতে সাহায্য করতে। অর্থাৎ, সে সময় আমি রাজনীতিতে মোটেই শিক্ষানবিশ ছিলাম না। আমি খুব দ্রুত বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়গুলো চিহ্নিত করতে শুরু করেছিলাম। আর অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, সোস্যাল ডেমোক্রেসির যে ধারণাগুলোতে আমি এখনো বিশ্বাস করি, আওয়ামী লীগ তখন তার খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিলো। তারপর আমি আরো প্রায় বিশ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় কাটিয়েছি। যার মধ্যে বাংলাদেশেই কাটিয়েছি বেশিরভাগ সময়। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি বন্ধুদের প্রায় বলি, যে দেশকে সহজে ভালোবাসা যায়, সহজে ঘৃণাও করা যায়! কখনো কখনো দুটো একসাথেই করা যায়।

শুনতে যত খারাপই লাগুক না কেনো, সত্যটা হচ্ছে, আমি যতবারই লম্বা সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে ফিরেছি, খুব কষ্টের সাথে লক্ষ্য করেছি, লেবার পার্টি অফ ইউকে, আর এর নেতৃত্ব আগের সময়কার দল আর নেতৃত্বের একটা ক্যারিকেচারে পরিণত হয়েছে। এই অনুধাবনের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে আরো একটি উপলব্ধিরও জন্ম হলো। তা হলো, কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে হয়তো দলীয় আনুগত্য পোষণ করে চলা আর সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের কোন একটির নেতৃত্বে এমন কোন ব্যক্তিত্ব নেই, যার দ্বারা কোন যুক্তি মেনে চলা মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা কিংবা দলীয় আনুগত্যবোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে আমার অনেক বন্ধু ও স্বজন আছেন, যারা মজ্জাগতভাবে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। আমার মত আমার বন্ধুরাও শক্ত ঈমানের মানুষ। বিশেষতঃ ভোট দেবার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আগামী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে তাঁরা অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রে এমন অনেক আদি রিপাবলিকান সমর্থক আছেন যারা কিনা তাঁদের দলীয় আনুগত্যকে সঙ্গে নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসছেন।

বাংলাদেশেও আরেকটা জাতীয় নির্বাচন আসি আসি করছে। কঠিন দলীয় আনুগত্য হতাশার ফাঁদে পড়ে পরিণত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষে। এই বিদ্বেষ এমনকি এই তর্ককেও উপেক্ষা করছে যে, প্রধানমন্ত্রীর যথাযথ বিকল্পজন কেউ আছেন কি নেই?

আমি আজীবন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হয়েও এখন মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি, ভয়ঙ্করতম জাতীয়তাবাদী এসএনপি পার্টিকেই আগামীতে ভোট দেবো। কারণ, লেবার পার্টির ব্যাপারে আমার পূর্ণ মোহভঙ্গ হয়েছে। আমার এ নতুন সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু নীতির বিবেচনা কাজ করেনি। এখানে ব্যক্তি-বিবেচনাই বড় ভূমিকা রেখেছে। যদিও আমি কিনকের আমলেই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলাম, তখন থেকেই একজন বয়সে বড় বন্ধুর এই অভিমত অস্বীকার করতে পারিনি যে, কিনকের কোন ‘তলা’ (নড়ঃঃড়স) নেই। তলা বলতে তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা আর সাহস বুঝিয়েছিলেন। হয়তো গেলো বছরগুলোতে অনেক অনেক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি আর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে উঠবস করার কারণেই এখন আমি নিজের অভিমতের ওপর আস্থা রাখি আগের চাইতে বেশি। দুঃখজনকভাবে, নিজের ওপর এই আস্থা আসার পর থেকেই আমার কাছে দলের চাইতে ব্যক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডানপন্থী এসএনপি-কে ভোট দেবার বিযয়ে আমার বিচার-বিবেচনা আমার বন্ধু ও স্বজনরা ভালোভাবে নেননি। আমার মনে হয়, অন্য সব জায়গার মত বাংলাদেশেও ভোটের হাওয়াতেও একই রকম বিচার-বিবেচনা প্রধান হয়ে উঠবে। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ