প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ এবং উপযোগ

শ্যামসুন্দর সিকদার : আমাদের আর একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বয়ং এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১৪ই জুন বেতবুনিয়াতে তিনি সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন। এইদিন সেখানে উদ্বোধন করেছিলেন উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র। সেই সূত্র ধরেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরির প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। স্যাটেলাইট প্রকল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলের নিরলস পরিশ্রম শেষে বহুল প্রতিক্ষীত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণ হয়ে গেছে। চূড়ান্ত দিনক্ষণ অনুযায়ী গত ১১ মে ২০১৮ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৪:১৪ মিনিটে অর্থাৎ ১২ মে ২০১৮ বাংলাদেশ সময় ভোররাত ২:১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কেইপ ক্যানাভেরাল-এ অবস্থিত লঞ্চপ্যাড খঈ-৩৯অ থেকে ঋধষপড়হ ৯ লঞ্চ ভেহিকেল ব্যবহার করে এই স্যাটেলাইট মহাকাশে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য অরবিটাল স্লট একটি প্রধান ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ঝঢ়ধপব চধৎঃহবৎংযরঢ় ওহঃবৎহধঃরড়হধষ (ঝচও) অরবিটাল স্লট অনুসন্ধান করে। এই অনুসন্ধান কালে ৪৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত আর্ক এর মধ্যে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক এর ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দাঘ্রিমা অরবিটাল স্লট লিজ/ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায় এবং সার্বিক দিক বিবেচনায় প্রকল্পের কারিগরী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ঝচও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্লটটি উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করে। অতঃপর ইন্টার স্পুটনিকের সাথে প্রথমে একটি ঘড়হ-ইরহফরহম গড়ট স্বাক্ষর হয় এবং পরে মোট ২৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরির জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯৬৮ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০০ কোটি টাকা কম ব্যয় করেই এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও পরিচালনার জন্য টার্নকি চুক্তির আওতায় ঢাকার অদূরে গাজীপুরে প্রাইমারী গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং রাঙামাটিতে সেকেন্ডারী গ্রাউন্ড কন্ট্রোলস্টেশন স্থাপন করা হয়। ঞযধষবং অষবহরধ ঝঢ়ধপব, ঋৎধহপব গাজীপুর ও বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের মূলভবন, ডরমেটরি বিল্ডিং ও ইউটিলিটি বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। থ্যালাস কর্তৃক মোট ১৫টি লটে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে আমদানী করা হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প টিমের তত্ত্বাবধানে থ্যালাস এর নিজস্ব দক্ষ প্রকৌশলীদের দ্বারা আমদানীকৃত যন্ত্রপাতিসমূহ ওহংঃধষষধঃরড়হ এর কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্পের ০৩ জন স্থানীয় পরামর্শক (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) গাজীপুর ও বেতবুনিয়া সাইটে অবস্থান করে নিয়মিতভাবে নির্মাণ কাজ তদারকি করেছেন।

এছাড়া, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প টিম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিআরসি, বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ঝচও ধারাবাহিকভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি গ্রাউন্ডস্টেশন এর নির্মাণ কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর নির্মাণও সকল পরীক্ষা সম্পন্ন হবার পর তা থ্যালাস এর ঈধহহবং ঋধপরষরঃু শিপিং কন্টেইনারে সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়। এর পর বঙ্গবন্ধুস্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান ঝঢ়ধপব ঊীঢ়ষড়ৎধঃরড়হ ঞবপযহড়ষড়মরবং ঈড়ৎঢ়. (ঝঢ়ধপবঢ), টঝঅ এর সাথে উৎক্ষেপণ তারিখের সমন্বয় করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ গত ২৯ মার্চ ২০১৮ তারিখে থ্যালাস এর ঈধহহবং ঋধপরষরঃু থেকে এন্টোনভ কার্গো বিমানে লঞ্চ ফ্যাসিলিটি ফ্লোরিডাতে প্রেরণ করা হয়। এপ্রিল ২০১৮ থেকে লঞ্চ ফ্যাসিলিটি ফ্লোরিডাতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে স্যাটেলাইট এর বিভিন্ন কারিগরী পরীক্ষা সম্পন্ন করে স্যাটেলাইট ফুয়েলিং করা হয়, সেই সাথে চলতে থাকে ঋধষপড়হ ৯ খধঁহপয ঠবযরপষব ওহঃবমৎধঃরড়হ. লঞ্চ প্যাডে পুনরায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সকল পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে স্যাটেলাইটটিকে রকেটের ফেয়ারিং এর ভিতরে রাখা হয়।

সবশেষে এটি রকেটের ২য় স্টেজের সাথে ইন্টিগ্রেশন করাহয়। ঞযধষবং, ঝঢ়ধপবঢ, ঝচও এবং স্যাটেলাইট প্রকল্প টিমের অংশগ্রহণে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ ১ মাসের কারিগরী কার্যাদি চলতে থাকে। ঝঢ়ধপবঢ এর ফ্যাসিলিটিতে খধঁহপয ঈধসঢ়ধরমহ সম্পন্ন করার পর কারিগরীভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয় এবং ঝঢ়ধপবঢ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের দিন তারিখ ঘোষণা করে এবং উৎক্ষেপণ করা হয়। কারিগরী বিনির্দেশ ও চূড়ান্ত ডিজাইন অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ১১৯.১ ডিগ্রি পূ.দ্রা. অরবিটাল লোকেশনে সফল তরঙ্গ সমন্বয় (ঋৎবয়ঁবহপু ঈড়ড়ৎফরহধঃরড়হ) সাপেক্ষে সমগ্র বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, লংকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান কাজাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশসমূহে কাভারেজের আওতায় আসবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে নিম্নবর্ণিত সুবিধাসমূহ পাওয়া যাবে :

১। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উন্নত টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক ডিজিটাল সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদেরকে সরাসরি শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে না গিয়েও রোগীর টেস্ট রিপোর্ট এক্্ররে-ইমেজ ইত্যাদি তথ্য ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে শেয়ার করে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার জন্য যে টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি আছে, তাও সম্ভব হবে এ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কভারেজ দেশের সর্বত্র বিদ্যমান, তাই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও দ্বীপেও এ সকল সেবা প্রদান করা যাবে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ও দক্ষ প্রফেসরের ক্লাস ই-লার্নিং বা ই-এডুকেশন পদ্ধতিতে ঘরে বসে সম্পন্ন করা যাবে।

২। কোনরূপ ক্যাবল সংযোগ ছাড়াই ঘরে রিসিভার যন্ত্র স্থাপন করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট টিভির বিভিন্ন চ্যানেল দেখা যাবে। ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে টিভিচ্যানেলের গুনগতমান ক্যাবল টিভির চেয়ে অনেক উন্নত।

৩। যে সব স্থানে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব নয় অথবা রেডিও ট্রান্সমিশন নেই, সেই সব জল ও স্থল সীমায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদান করা যাবে।

৪। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাৎ ঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পে টেলিযোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত অপিটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বা ট্রান্সমিশন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে।

৫। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি দেশের বাহিরের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এ ২০টি ট্রান্সপন্ডার লীজ বা ভাড়া প্রদান করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। অর্থ্যাৎ বর্তমানে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তার পরিবর্তে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবো।

৬। বর্তমানে বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ দেশের সব কয়টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠানসূচি সম্প্রচারের জন্য বিদেশীস্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে বিদেশী স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীলতা আর থাকবে না এবং বিদেশী স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রদেয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

৭। ডিটিএইচসহ স্যাটেলাইট ভিত্তিক নতুন সেবার মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগ হবে এবং এসব বিভিন্ন সেবায়লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

৮। স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যা দেশেরবেকারত্ব কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

৯। সর্বোপরি স্পেস টেকনোলজির জ্ঞান সমৃদ্ধ একটি মর্যাদাশীল জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট অনবদ্য ভূমিকারাখবে ।

বাংলাদেশ কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানী কর্তৃপক্ষ ঐসব সুবিধা গ্রহনের জন্য কাজ শুরু করেছে । এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর দ্বারা পরীক্ষামূলকভাবে সাফ ফুটবল খেলা টেলিভিশনে সম্প্রচার করেছে । দেশে ও বিদেশে বিপণনের কাজও শুরু করেছে। দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলসমূহ এবং সরকারি বেশকিছু অফিসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিটিভি, ৭১ টিভি, বিজয় টিভি, বিবিসি নিউজসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিদেশে বিপণনের জন্য আন্তর্জাতিক এজেন্ট হিসেবে থাইল্যান্ডের একটি কোম্পানী থাইকমকে নিযুক্ত করা হয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের এই নিজস্ব স্যাটেলাইট বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে খুব শীগগিরই এবং এটি চালু হলে বিদেশী স্যাটেলাইট এর ভাড়া বাবদ বছরে সাশ্রয় হবে ৮ মিলিয়ন ইউ এস ডলার। অধিকন্তু আয় হবে গড়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার। (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানী)

সুতরাং এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মহাকাশ জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ একদিকে যেমন প্রযুক্তির উত্তরণে শামিল হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায়ও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

লেখক : সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ