প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্জন যাই হোক, নির্বাচন বর্জন নয়

বিভুরঞ্জন সরকার : সংলাপ বা আলোচনা হলো গত কয়েক দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বা ‘টক অফ দ্য কান্ট্রি’। সরকার তথা আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবে- এটা ২৮ অক্টোবরের আগেও ছিল প্রায় অসম্ভব অথবা অনেকের ভাবনার বাইরে । কিন্তু ১ নভেম্বর সেটা বাস্তব হয়েছে। চরম বিবদমান দুই রাজনৈতিক শক্তি আলোচনার টেবিলে বসেছে, মুখোমুখি বসে কথা বলেছে এবং পুরো ঘটনাটি ঘটেছে আন্তরিক পরিবেশে। যদিও আওয়ামী লীগ বলেছে, তারা বিএনপির সঙ্গে নয়, কথা বলেছে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে। বিএনপি ছাড়া ঐক্যফ্রন্ট যে শূন্য কলস, সেটা দেশের মানুষ জানে। রাজনীতিতে শেষ কথা নেই বলে যে চরম সুবিধাবাদী একটি কথা চালু আছে সেটাই আমরা আবারো সত্য হতে দেখলাম। দেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে সরকারে আছে। সরকারে এবং সংসদীয় রাজনীতিতে নেই বিএনপি। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না করা ছিল দলটির একটি ঐতিহাসিক ভুল। বিএনপি ভেবেছিল তারা অংশ না নিলে দেশে নির্বাচন হবে না। একতরফা একটি নির্বাচন হলেও সে সরকার ক্ষমতায় স্থায়ী হতে পারবে না। তাদের এই ধারণাও সত্য হয়নি। সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচনের পথে দেশ। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা?

বিএনপি মনে করে, দলীয় সরকারের অধীনে অর্থাৎ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থেকে যে নির্বাচন হবে সেটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। তাই তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু বিএনপির এই চাওয়া বাস্তবে প্রতিফলিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় আওয়ামী লীগ তথা ক্ষমতাসীন সরকার। সরকার সংবিধানের বাইরে যাবে না। আর সংবিধানে নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ সরকারের বিধান নেই।

আন্দোলন করে সরকার পতনের সর্বাত্মক চেষ্টা করেও বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। দলটির ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও ভুল রাজনৈতিক কৌশল বিএনপিকে এখন খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। তার ওপর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় দ-িত হয়ে কারাগারে থাকায় বিএনপি চরম সাংগঠনিক সংকটেও পড়েছে। সব বিবেচনাতেই বিএনপি এখন দৃশ্যমান রাজনীতিতে পিছিয়ে আছে, সাংগঠনিকভাবেও তারা এলোমেলো, অগোছালো। আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে।

ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ কয়েকটি ছোট দল নিয়ে সরকারবিরোধী একটি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে সরকারের ওপর যতোটা চাপ সৃষ্টি করা যাবে বলে বিএনপি ভেবেছিল তা-ও সঠিক হয়নি। ঐক্যফ্রন্টে সরকার বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে শামিল করা যায়নি। এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণভবনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অন্য অনেকের সঙ্গে আলোচনা হলেও মানুষের আগ্রহ ঐক্যফ্রন্টকে নিয়েই । কারণ ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি আছে। রাজনীতিকে প্রভাবিত বা আলোড়িত করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ছাড়া আর কারো নেই।

গণভবনের আলোচনায় অর্জন কি, কে কি পেলো সেটা নিয়েই এখন চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। আলোচনায় নগদ প্রাপ্তি বিএনপির জন্য উৎফুল্ল হওয়ার মতো নয়। নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার না থাকার প্রশ্নটা গৌন হয়ে যাচ্ছে। সংসদ বহাল থাকছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবে শেষ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির ব্যবস্থা হলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না বলার মতো কিছু না পেলে কোন মুখে নির্বাচনে যাবে বিএনপি? বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির বেশিরভাগই আদায়যোগ্য নয়। এটা বিএনপি জানে, অন্যরাও জানে। বড়টা চাওয়া হয় ছোটটা পাওয়ার আশায়। কিছু না পেলে সম্মান থাকে না।

তবে বিএনপির মধ্যে বিজয়ীর মনোভাব তৈরি হতে পারে, তারা বিজয় মিছিল বের করতে পারে- এমন সুযোগ হয় তো সরকার দিতে চাইবে না। বিএনপিকে হারমানা অবস্থায়ই রাখতে চাইবে সরকার। সরকার এবার একদিকে যেমন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাইছে, অন্যদিকে তেমনি আবার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতেও চাইছে।

এখন প্রশ্ন আসছে, তাহলে সংলাপ বা আলোচনায় বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার অবস্থা কি তৈরি হয়েছে বা হবে ? বিএনপি কি ‘বিশেষ’ কিছু না পেয়েই নির্বাচনে যাবে? না, বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত করবেন না প্রধানমন্ত্রী। গরম বক্তৃতা না দিয়ে মামলা-হামলা থেকে নির্বাচনের সময় স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা আদায় করতে হবে বিএনপিকে। কারণ নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া বিএনপির সামনে খুব ভালো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। আলোচনায় অর্জন যাই হোক, নির্বাচন বর্জন নয়- এটাই এখন হওয়া উচিত বিএনপির বক্তব্য এবং লক্ষ্য। বিএনপি যদি এবারই ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করে বসে থাকে তাহলে তারা নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনবে। বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে দলের ঐক্য অটুট থাকার স্বার্থেই। সরকার তথা আওয়ামী লীগ আগেও রাজনীতির চালকের আসনে ছিল, আলোচনার পর এই অবস্থান আরো সংহত হয়েছে। কাজেই বিএনপিকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবেচিন্তে,কারো দ্বারা, কোনোভাবে প্ররোচিত না হয়ে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি আদায় করা যাবে না। সাত দফা আদায় নয়, একটি সেফ প্যাসেজ দরকার এখন বিএনপির। সরকার সেই প্যাসেজ বা স্পেস বিএনপিকে দেয় কিনা সেটাই দেখার বিষয় এখন সেটাই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ