Skip to main content

‘দেবী’ ভৌতিক নাকি বিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচন?

মহিব আল হাসান: ‘দেবী’ শুরু থেকে আলোচনায়। মানুষ দেবী সিনেমা দেখবেন মানুষের ভিড়ে! সেরকম ইচ্ছা ছিল। তবে মানুষের সমারোহে নয় দেখা হলো সিনেমাটি ঠিকই মুষ্টিময় দর্শক সারিতে বসে। প্রচার-প্রচারণায় অভিনব কায়দা করেছিলেন জয়া আহসান। সাথে বাদ যান নি চঞ্চল চৌধুরী। দর্শকদের অভিনব কায়দায় সিনেমাটির প্রচার-প্রচারণার একটা কারণ ছিল দর্শকরা দল বেঁধে ছবিটা হলে গিয়ে দেখে আসুন, সেই মিসির আলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কীভাবে হাজির হয় রুপালি পর্দায় তা দেখার তীব্র আগ্রহবোধ ছিল দর্শকের। প্রথমদিন প্রথম শো থেকে দর্শক হলে টানতে সফল হয়েছে ‘দেবী’ টিম। ছবিটি অন্য সব ছবি থেকে ছিল আলাদা কারণ, ছবিটি নাচ-গান-ফাইট আর কমেডি সমৃদ্ধ ট্র্যাডিশনাল কিছু নয়। একেবারেই ফর্মুলার বাইরে গিয়ে নতুন ফর্মুলায় বাংলা ছবি। গত ১৯ অক্টোবর দেশের ২৮টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে অনম বিশ্বাস পরিচালিত ছবি ‘দেবী’। ছবিটি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পায়। এ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পাওয়া একটি মাত্র ছবি। সাথে জয়া আহসানের প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। সবমিলিয়ে দর্শকদের বাড়তি আনন্দ। একজন পরিচালক হিসেবে ‘দেবী’ অনম বিশ্বাসের প্রথম সিনেমা। আবার প্রযোজক হিসেবে জয়া আহসানেরও অভিষেক হলো। ‘দেবী’ পরিচিতি: সিনেমার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক আলাপে গল্প বলতে নেই। তবে ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘দেবী’র গল্প বলে গেছেন। রানু আনিসের সংসার। সংসারে ঝামেলা। ঝামেলার সৃষ্টি রাতের বেলায় রানুকে কেউ ডাকে ভৌতিক উপায়ে। রানু স্বপ্নে যা দেখে তাই হয়। এক সময় রানুর স্মামী যায় মিসির আলীর কাছে। রানুর দৃষ্টি ও শ্রুতি বিভ্রম রহস্যের সমাধানে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের খন্ডকালীন শিক্ষক মিসির আলি। আর এই অনুসন্ধানে মিসির আলি একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছান ঠিকই। কিন্তু রানুর অলৌকিক ক্ষমতার হিসাব মেলাতে মেলাতে সিনেমা শেষ পর্যায়ে চলে আসে। এর বেশি গল্প আর বলার দরকার পড়ে না। ভালো লেগেছে যা: ১. দেবীর দেখে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় দর্শকদের শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় রেখেছিলেন নির্মাতা ২. ছবিতে ছোট ছোট হিউমার অর্থাৎ হাসির পাঞ্চগুলোতে দর্শক ঠিকই হেসে মাতিয়ে তুলেছিল সিনেমা হল। যেমন ‘গোবরে পদ্মফুল’ ফোটে সেই সুত্রকে কাজে লাগিয়ে কমেডে গোলাপ লাগানোর মজাদার বিষয় ছিল! ৩. যারা ভয়ের রাজ্যে যেতে চায় অথ্যাৎ হরর ফিল্মের সাথে আড্ডা দেয় তাদের জন্য এই ছবিতে ‘অলৌকিক শক্তি’, সেহেতু ভৌতিক আবহ তৈরি করাও ছিল একটা বাড়তি পাওয়া দর্শকদের জন্য। যেমন ছায়ার দৃশ্য, নূপুরের শব্দ, হেটে যাওয়ার আওয়াজ,টুপটাপ শব্দগুলো অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে ছিল দর্শকদের জন্য ভয়ের কিছু স্মৃতি। ৪. শব্দ দিয়ে ভৌতিক কিংবা রহস্যের আবহ তৈরির চেষ্টা ছিল। যা মন্দ লাগেনি। রানু বলে ডাক দেওয়া কিংবা হঠাৎ কারও গলার আওয়াজে অনেক দর্শক পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। অনেকেরই ধারণা ছিল আওয়াজ আসছে দর্শক সারি থেকে। ৫. অভিনয়ের জয়া আহসানের কাছ থেকে দর্শকরা যা আশা করেছিলেন তার চেয়েও অনেক বেশি উজার করে দিয়েছেন। অন স্ক্রিন তিনি ছিলেন 'ওয়ান ম্যান শো'। আর কিছু বলার কি দরকার আছে? দ্বিতীয়ত, চঞ্চল চৌধুরীর প্রশংসাও করতে হয়। মিসির আলি চরিত্রে অভিনয়ে তাকে মানিয়েছে বেশ। বিশেষ করে তার চুল আর কণ্ঠ- একশতে একশ। তবু কোথায় যেন মিসির আলির কিছু একটা অনুপস্থিত মনে হয়েছে। হতে পারে মেকআপ-গেটআপ। সে দায় অবশ্য চঞ্চলের কাঁধে দেয়া যায় না। স্ক্রিপ্টের মধ্যে থেকে যতটুকু মেলে ধরা যায় তার সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন চঞ্চল। ৬. অন্য আরেকটি বিশেষ চরিত্র নীলু। অভিনয় করেছেন শবনম ফারিয়া। দুজন হেভিওয়েট শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করা শবনম ফারিয়াকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু হলে ঢুকে সেই ভুল ভাঙল। আশ্চর্যজনকভাবে জয়া-চঞ্চলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করে গেছেন ফারিয়া। তার লুকটাও ছিল অসাধারণ। পাশের বাড়ির মেয়েটার মতো। এছাড়াও ছোট ছোট চরিত্রে যারা ছিলেন তারাও তাদের কাজটুকু ঢেলে দিয়েছেন। যেমন সোলায়মান খোকা অন্যতম। ৭. এই ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় সঙ্গীত, লোকেশন, সাউন্ড ডিজাইন, লাইট ও ক্যামেরা ও সম্পাদনার কাজ। ধারণা করা যেতে পারে, এই মানের টেকনিক্যালি সমৃদ্ধ সিনেমা আমাদের এখানে আর হয়নি। অথচ এটি সরকারি অনুদানের ছবি। দেবীতে যা অতৃপ্তির অতিমাত্রা ছিল: ১. ছবিতে জয়া আহসানকে বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। অন্য শিল্পীদের থেকে স্ক্রীণে তার বিচরণ ছিল বেশ। এতে অন্যদের অভিনয় দেখার সুযোগটা খুব একটা বেশি সময় হয়নি। ২. ছবিতে জয়া আহসানের স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করা অনিমেষ আইচ। তার অভিনয় করাটাও ছিল অনেক দূর্বল । আগেও বেশ ভালো অভিনয় করা এবারের ক্যানভাসটায় এসে জমাতে পারেননি। ৩. মিসির আলি সবকিছুকে বিচার করেন বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে। কিন্তু ছবিতে ভৌতিক রহস্য উন্মোচন নাকি বিজ্ঞানের উন্মোচন হলো তা দেখানো হয়নি। এই প্রশ্নটা দর্শক মনে থেকেই যায়। শেষে নীলুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা সিনেমাটিকে ভৌতিক দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলেই মনে হয়েছে। ৪. ছবিতে মিসির আলির প্রভাব ছিল না। পুরোটাই রানুর অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। মিসিরের আরও অনুসন্ধান, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অপেক্ষা করতে করতেই যেন সিনেমাটা শেষ হয়ে গেলো। তার চরিত্র দিয়ে সিনেমায় অন্যরকম থ্রিল অনুভূতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল। সে জায়গায় কোনও উপস্খি ছিল না। ৫. সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এটি ছবি নয়, সুন্দর একটি টেলিফিল্ম হয়েছে। ৬. তবে কথা থেকে যায় একজন জনপ্রিয় লেখকের অন্যতম একটি সৃষ্টি নিয়ে সিনেমা তৈরি করা। যে গল্প পড়া হয়েছে ছাপা অক্ষরে তা ছবিতে দেখা কতটা দর্শক টেনেছে? কিন্তু যারা পড়েনি এবং ভৌতিক গল্প ভালোবাসেন তাদের জন্য মন্দ নয়। সবশেষ আলোচনায় বলতে হয়, বাংলা সিনেমায় দেবী’র মতো পরিপাটি সিনেমা আরও বেশি বেশি জরুরি। বাংলা সিনেমার উন্নতির স্বার্থে দেবীর মতো প্রচারণাও জরুরি। অনম বিশ্বাসের মতো তরুণ পরিচালক, জয়া আহসানের মতো প্রযোজক– এমন আরও ক’জন জুটলেই সিনেমা হলগুলো বন্ধ হওয়া থেকে বেঁচে যাবে বলেই বিশ্বাস। একনজরে দেবী: নাম: দেবী- মিসির আলি প্রথমবার রেটিং: ৭/১০ মুক্তি: ১৯ অক্টোবর ২০১৮ প্রেক্ষাগৃহ: ২৮টি শিল্পী: জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী, অনিমেষ আইচ, শবনম ফারিয়া, ইরেশ যাকের প্রমুখ। পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও সংলাপ: অনম বিশ্বাস প্রযোজক: জয়া আহসান ও সরকারি অনুদান সংগীত: অনুপম রায়, প্রীতম হাসান, এম জি কিবরিয়া আবহসংগীত: প্রবুব্ধ ব্যানার্জি শিল্পনির্দেশক: সামুরাই মারুফ সিনেমাটোগ্রাফি: কামরুল হাসান খসরু সম্পাদনা: সজল সরকার প্রচার পরিকল্পনা: রুম্মান রশীদ খান পরিবেশনা: জাজ মাল্টিমিডিয়া।