প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহাপরিকল্পনা

ড. এমদাদুল হক : পরিকল্পনা যদি স্থান-কালের গ-ি অতিক্রম করে তবে তা হয়ে যায় মহাপরিকল্পনা। স্থান-কাল ছাড়া পরিকল্পনা হয় না। তার মানে, মহাপরিকল্পনা হলো পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। জানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হলে পরিকল্পনার প্রয়োজন। অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হলে মহাপরিকল্পনার প্রয়োজন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব না। অনানুষ্ঠানিক দীক্ষা মহাপরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব না।

পরিকল্পনা হলো ফলের আশায় কর্ম। মহাপরিকল্পনা হলো নিষ্কাম কর্ম। পরিকল্পনা যদি থাকে, তবে কাঙ্খিত ফল না পাওয়া গেলে মনস্তাপ উৎপন্ন হবেই। মহাপরিকল্পনায় মনস্তাপ নেই, কারণ ফলের আশা নেই। নদী নকশা মেনে চলে না- জীবনও চলে না পরিকল্পনা অনুযায়ী। গন্তব্য নয়- জীবনের অভিযাত্রাটিই যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সে অতীতের স্বৃতি থেকে মুক্ত, ভবিষ্যতের কল্পনা থেকে মুক্ত- তাই সে মুক্ত পরিকল্পনা থেকেও।

মহাপরিকল্পনায় যে সমর্পিত, তার কাছে এখনই একমাত্র সময়। সে কাজ করে আন্তরিকতার সঙ্গে; কারণ কাজ তাকে আনন্দ দেয়। সে খেলে জানপ্রাণ দিয়ে, কিন্তু গোলপোস্ট নাই। সে যেদিকে বল মারে সেদিকেই গোলপোস্ট- প্রতি পাদপ্রহারে গোল। গোল দিতে হলে পরিকল্পনার প্রয়োজন। প্রতি পাদপ্রহারে গোল দিতে হলে প্রয়োজন মহাপরিকল্পনা।

মহাপরিকল্পনার মহাধারা: যা আছে তা নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাক। ভাবে পূর্ণ থাক যেন অভাব তোমাকে স্পর্শ না করতে পারে। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো- আরো চাই, আরো। মহাপরিকল্পনার বিধেয় হলো- ‘তোমার এখনই যথেষ্ট আছে’, যতটুকু থাকলে প্রেমে থাকা যায়, প্রশান্তিতে থাকা যায়, আনন্দে থাকা যায়, পরমানন্দের জগতে প্রবেশ করা যায়, তার চেয়ে কিছু বেশি এখনই আছে। যদি তুমি তোমার প্রাচুর্য্য বুঝতে পার, তবে এখনই তুমি অভাবমুক্ত পরমসত্তা। ভুলে যেও না, তুমি সেই পিতার সন্তান, যিনি সমগ্র আসমান-জমিনের মালিক। অসীম ধনবান পিতার সন্তান, দরিদ্র হতে পারে না।

পরিকল্পনায় রয়েছে কাজ, কাজ আর কাজ; ব্যস্ততা, ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। মহাপরিকল্পনায় রয়েছে প্রেম প্রেম আর প্রেম। পরিকল্পনায় রয়েছে উদ্বেগ, দ্রুত সারতে হবে। মহাপরিকল্পনায় রয়েছে আনন্দ। আনন্দ তাড়াতাড়ি করা যায় না। তাড়াতাড়ি প্রেম করে কোন গর্দভ? পরিকল্পনা অশান্ত। মহাপরিকল্পনা শান্ত। পরিকল্পনা অধীর। মহাপরিকল্পনা ধীর। ধীরে চলে সময়- ধীরে আসে বর্ষা, ধীরে আসে বসন্ত। ধীরে চলেও সময় কী সুন্দরভাবেই না তার সমস্ত কার্য সম্পন্ন করে! কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। কোথাও ছন্দের পতন নেই।

তাড়াতাড়ি করে আমরা কোথায় যাই? কেন এত গতি? এই তীব্র গতি অন্তিমে কোথায় নিয়ে যায় আমাদের? কবরে। যদি গতির গন্তব্য হয় কবর, তবে কেন এত তাড়া?

মহাপরিকল্পনায় তাড়া নেই। এমনকিছু নেই যা করতেই হবে। এমনকিছু নেই যা না করলে চলবেই না। যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে। যা হবে ভালোই হবে। যা ঘটে তা ঘটা অনিবার্য বলেই ঘটে। সুতরাং তাড়া কিসের? কেন তাড়া?

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। পরিকল্পনা করে ধর্মের কল নড়ানো যায় না। এটি নড়ে মহাপরিকল্পনার অধীনে। বাতাসে। বাতাস চলে না মনুষ্য পরিকল্পনায়। সুতরাং কিসের তাড়া? কিসের নিয়ন্ত্রণ?

পরিকল্পনা পরিধির। মহাপরিকল্পনা কেন্দ্রের। কী হবে পরিধি নিয়ন্ত্রণ করে, কেন্দ্র ছাড়া? অবস্থান করি কেন্দ্রে। কেন্দ্রে অবস্থান করবো কীভাবে? ‘কীভাবে’ প্রশ্নের উত্তর দেয় পরিকল্পনা। মহাপরিকল্পনা প্রশ্নটিই দেয় উধাও করে।

পরিকল্পনায় রয়েছে পরিধি নিয়ন্ত্রণ, পোশাক পরিবর্তন, সুরত পরিবর্তন। এসব পরিবর্তন শুধুই বিভ্রম। ঘটনা ঘটে না মনুষ্যের পরিকল্পনার আধারে। ঘটনা ঘটে মহাপরিকল্পনায়। বিদায়কালে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। জীবন ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। সব সফলতা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মানুষ ভাবে একটা, হয়ে যায় আরেকটা।

পরিধি, পরিবেশ ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিপ্রায় থেকেই উৎপন্ন হয় দ্বন্দ। সব পরিকল্পনাই তাই দ্বন্দের পরিকল্পনা। মহাপরিকল্পনা কাউকে নিয়ন্ত্রণ করে না। মহাপরিকল্পনা বিশ্বাস করে স্বাধীনতায়। যার যা খুশি করুক। উপসংহারে তাকে ফিরে আসতেই হবে মহাপরিকল্পনায়।

পরিকল্পনা ছাড়া কাজ চলবে কেমন করে? চলবে। ঘূর্ণিঝড়ে শান্ত থাকার দীক্ষা সহজে পাওয়া যায় না। সময় লাগে।

পরিকল্পনা যাদের খুশি করুক। যারা ‘কিছু একটা’ হতে চায় তাদের জন্য তো পরিকল্পনার প্রয়োজন আছেই। ‘কিছু একটা’ হওয়ার বাসনা যার নেই, কেবল সেই সমর্পিত হতে পারে মহাপরিকল্পনায়। নাবিকের গন্তব্য নির্দিষ্ট। সাধকের জন্য অভিযাত্রাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণায়ামের পরিকল্পনা আছে- বায়ুর পরিকল্পনা নেই। বায়ুর প্রবাহ মেনে চলে মহাপরিকল্পনা। বাতাস আসে বাতাস যায়, চেরির একই ডাল একইভাবে দুইবার দোলে না। নৌকাগুলো ছুটে চলে গন্তব্যের দিকে কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ? ঢেউ আসে, ঢেউ যায়- কোনো গন্তব্য নেই তার। সে যে মহাসমুদ্রের অংশ। যাবে কোথায়? যেখান উদয়, সেখানেই বিলয়।

পরিকল্পনা ছাড়া সাফল্য আসবে না; হ্যাঁ, তা তো বটেই। কিন্তু কোন সাফল্য? কাকে আমরা সাফল্য বলছি? ক্ষমতায় যাওয়া কি সাফল্য? বিত্তবান, খ্যাতিমান হওয়া কি সাফল্য? এসব সাফল্য ব্যর্থতার মতোই বিপজ্জনক। আশা, হতাশার মতোই প্রবঞ্চক। সফলতার মই বেয়ে যে যত বেশি উপরে উঠে, ভয়ে তার হাত-পা তত বেশি কাঁপতে থাকে। মাটিতে যে আরামে দাঁড়ায়, তার ভিত্তিটি হয় মজবুত। তার কল্পনা টলমল করে না, পড়ে যাওয়ার শঙ্কা তার নেই। যে মাটিতেই আছে সে পড়েই বা যাবে কোথায়?

নিজের চরকায় তেল দাও- উপচে পড়বে। পরের চরকায় তেল দাও- ফুরিয়ে যাবে। টানতে থাক- ছিঁড়ে যাবে। শান দিতে থাক- ভোঁতা হয়ে যাবে। সঞ্চয় বাড়াতে থাক- ভয় বাড়তে থাকবে। নিরাপত্তা বাড়াতে থাক- বিপদ বাড়তে থাকবে।

উচ্চতর জ্ঞানের সন্ধান কর- প্রজ্ঞা আসবে। প্রেম দাও- আনন্দধারা উপচে পড়বে। আনন্দ বাড়াতে থাক- পরমানন্দ আসবে। দুটি পথই উন্মুক্ত আছে। কোনদিকে যাবে, স্বয়ং চয়ন কর।

পরিচিতি: সভাপতি, জীবনযোগ ফাউন্ডেশন