প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিবেক, একটু কেঁদে  উঠো

এস আই তানভী : আমরা আজ কোন যুগে বসবাস করছি? কাকে এই প্রশ্ন করবো? ভাবতে গিয়ে বারবার শিউরে উঠি, চমকে উঠি, বুকের বাম পাশে  কুঁকড়ে ওঠে চরম এক ব্যথা। মাঝে মাঝে যেন নিশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে হৃদয়ের রক্ত। চোখেআগুন জ্বলে। মানুষের বিবেক আজ কোথায়? হতভম্ব হয়ে যাই মানুষের অতি অমানবিক কার্যকলাপ দেখে। বাছবিচার, ভালোমন্দ, সহানুভূতি, আন্তরিকতা, রুচিবোধ দয়া-মায়া সব যেন মানুষ আজ ভুলে গেছে। প্রতিদিন কোন না কোন অমানবিক, অমানুষিক ঘটনা ঘটছেই।  সময়ের নিয়মে হারিয়ে এসব ঘটনা বিলীন হয়ে গেলেও কিছু কিছু ঘটনা অনেকদিন মনে থাকে।

২০১২ সালে ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার একটা বাড়ির চারতলার ছাদ থেকে হিমু  নামে এক যুবককে পাগলা কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নিমর্মভাবে নির্যাতন করে সেখান থেকে ফেলে দেয় অভিজাত পরিবারের কয়েকজন বখাটে যুবক। গুরুতর আহত হয়ে হিমু ২৬দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৩ মে, ২০১২ তারিখে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। কত বর্বর ঘটনাÑভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসে।

আদুরী নামে এক গৃহকর্মী ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারা এলাকায় একটি ডাস্টবিনের পাশ থেকে কঙ্কালসার, অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। যার দেহ নির্যাতনের সব পরীক্ষা চালানোর সাক্ষ্য দেয়। ইশ! মানুষকে আজ মানুষ ভাবতেও লজ্জা হয়।

২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে ১৩ বছরের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আর হত্যার বর্বর সেই দৃশ্য তারা হাসতে হাসতে ভিডিও করে। উক্ত সালের আগস্ট মাসেই মোটর গ্যারেজ শ্রমিক রাকিবকে খুলনা শহরের টুটপাড়ায় একটি গ্যারেজে মলদ্বারে নল দিয়ে হাওয়া প্রবাহিত করে হত্যা করা হয়। কত নির্দয় মানুষ!  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় চুরির অপবাদ দিয়ে নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক কায়দায় দুই কিশোর আল ইমরান (১৫) ও ইমরান আহমদ (১৬) কে নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের চোখ বেঁধে বুকে-পিঠে পেরেক ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ভাবতেও বড় কষ্ট হচ্ছে। শুধু কি এই! আরো অনেক আছে। ১ নভেম্বর, ২০১৭। আরজিনা বেগম (৩০) তার পরকীয়া প্রেমিক রঙমিস্ত্রি শাহীন মল্লিক (২৫) সহ প্রাইভেটকার চালক স্বামী জামিল শেখ (৩৮) কে হত্যা করে। হত্যার দৃশ্য দেখে ফেলায় সেই পাষ- নারী তার ৯ বছরের মেয়েকেও মেরে ফেলে এবং দুটো লাশ মেঝেতে রেখে রাতভর শাহিনের সাথে সঙ্গমে মত্ত থেকে ডাকাতির নাটক সাজায়। আড়াইহাজারে পরকীয়ার জেরে, শেফালী আক্তার নামে আর এক পাষ- মা ও তার প্রেমিক মোমেন মিলে দু’সন্তানকে পুড়িয়ে মারল ১৩ এপ্রিল, ২০১৮। এই নারীদের মতো আরো অনেক নারী নিজেদের বর্বরতা দেখিয়ে বাংলাদেশের কোমলমতি মায়ের জাতটার বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে। ২১শে জুলাই, ২০১৮। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পায়েল (২২) হানিফ পরিবহনে দৌড়ে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি থামিয়ে হানিফ পরিবহনের ড্রাইভার, সহকারী ও সুপারভাইজার তাকে মেডিকেল না নিয়ে বা চিকিৎসার কোনরকম ব্যবস্থা না করে ইট দিয়ে মাথা মুখ থেতলে দিয়ে নির্মমভাবে খুন করে লাশ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মদনপুরে ফেলে দেয়। মানুষ আজ আর মানুষ নেই।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। তাঁর অনেক আগে থেকে এই একই কথা বলা আছে পৃথিবীর সব ধর্মে। তাহলে কি এরা কোন ধর্মেরই শিক্ষা লাভ করে নি! পৃথিবীতে যুগে যুগে মানবতার গান নিয়ে এসেছেন নবী-রাসুল, দেবতা, মুনিঋষি, কবি-সাহিত্যিকগণ। আজ মনে হয় সবার চেষ্টা বিফল। বরং মানুষের মন থেকে দিনদিন এই গুণ কমে যাচ্ছে। যার উদাহরণ স্বরূপ, ২০১৭ সালে ১৭ অক্টোবর, পারভীন নামে এক অভাগী টাকার অভাবে কয়েকটা হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে  আজিমপুর ‘মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান’ এর সামনে চলন্ত রাস্তার উপর দিবালোকে সন্তান প্রসব করেন। জন্মের পরেই সন্তানটি মারা যায়। এই ঘটনা আমার হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে তা শুকাতে না শুকাতেই গত ১৯.১০.১৮ তারিখে এক বছর দুই দিনের মাথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ক্লিনিকের ছাদ থেকে চার দিনের শিশুকে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে সীমা আক্তার নামে এক নারী। আসলে আজ মানুষের মনে মানুষের জন্য  যেমন কোন দয়া মায়া নেই, তেমনি নিজের জন্যেও নেই।

আর ওপরের সব ঘটনা যেন হারিয়ে গেলো ২৪ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার হওয়া  ফেনী শহরতলীর শর্শদি লাকায় নির্মমভাবে নির্যাতিত প্রিয়াংকা আক্তার নামে ৬ বছরের এক কন্যা শিশুর কাছে। শাহানা আক্তার শাহেনী নামে এক ডাইনী ছিলো তার মা, মেয়েটি জন্মের পর থেকে তাকেই মা বলে জানে। অথচ এই ডাইনী তার কচি শরীরে মোমবাতির আগুনে ছেঁকা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে সমগ্র মানবজাতির মানবতাকে। কি এমন অপরাধ ছিলো তার! সেতো জানতোই না যে, এটা তার পালক মা। জানলাম এই শাহেনী অশ্লীল যুগের সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতো। সেতো একজন নারী, একজন মা, একটা পৃথিবী…অথচ; দয়াহীন, মায়াহীন, বিবেকহীন, নিষ্ঠুর, জঘন্য কীট, লৌহ মনের ডাইনী। মানুষ এতো নিষ্ঠুর হয় কেমন করে! ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনা জানার পর এবং প্রিয়াঙ্কার ক্ষতবিক্ষত কচি দেহের ফটো দেখার পর থেকে শুধু কানের ভিতর ঘুরে বেড়াচ্ছে ভূপেন হাজারিকা’র সেই গান, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি…মানুষ পেতে পারে না! ও বন্ধু…।’ জোহরা আক্তার নামে যে  নারী প্রিয়াঙ্কাকে ঐ ডাইনীর হাত থেকে উদ্ধার করে স্বামীর সাথে পরামর্শ করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছে তাঁর জন্য রইলো শত শ্রদ্ধা। দয়া-মায়াহীন, নিষ্ঠুর  মানুষগুলোর মাঝে পৃথিবীতে জোহরার মতো গুটিকয়েক ভালো মানুষ আছে বলেই হয়তো পৃথিবীটা আজো টিকে আছে।  আসুন আমরা নিজেদের গায়ে চিমটি কেটে উপলব্ধি করি যে, আমরা যেমন মানুষ…ওরাও তেমন মানুষ। মানুষ মানুষের জন্যে।

সর্বাধিক পঠিত