প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফুলের বাগানে কালো সাপ!

শেখ মিরাজুল ইসলাম : চারপাশের অবস্থা দেখে আশি দশকের একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গানের কথা মনে পড়ছে। ‘শিশুকাল ছিলো ভালো, যৌবন কেন আসিলো, বাগিচায় ফুল ফুটিলো কোকিল কেন ডাকিলো।’ এই আনন্দঘন উত্তেজনাময় এবং সংশয় ঘেরা গানের অন্তর্নিহিত সংলাপের অর্থ নিশ্চয় কাউকে ভেঙে বোঝাতে হবে না। বাংলাদেশ জন্মের পর শিশুকালে খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়নি। রাজনৈতিক হত্যাকা- আর ষড়যন্ত্রের নীলনকশায় বারবার তার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু এখন বয়সের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্র অনেক এগিয়েছে। দারিদ্র্যসীমার হার কমেছে, শিক্ষিতের হার বেড়েছে, জনগণের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির হার যেকোনোভাবেই হোক তার শিশুকাল থেকে এখন অনেক ভালো অবস্থায় আছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রের লব্ধপ্রাপ্ত যৌবনসূত্রে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের শরীরে বাড়তি মেদ যোগ হয়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে যারা বৈধ সম্পদের অভাবে অপুষ্টিজনিত রোগে কষ্ট পাচ্ছিলেন, তারা পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রের যৌবন দশা প্রাপ্তির সাথে সাথে ভুগতে থাকলেন বাড়তি ওজন এবং মেদ-ভূড়িজনিত নানাবিধ সমস্যায়। একইভাবে রাষ্ট্রের শিশুকালে আইনের হাত কারও মাথা ও শরীরে স্বস্তির পরশ বুলাতো, যৌবনকালে সেই একই হাত অনেক নিষ্ঠুরভাবে তাদের আঘাত করতে দেখেছি। আবার এর উল্টো চিত্রও আছে। শিশুকালে আইনের হাত কাউকে নিগ্রহ করলেও বড় বেলায় সেই হাত দিয়েছে শাস্তির বদলে দুই দ- শান্তি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের চপলতা ছেড়ে রাষ্ট্রের অন্দরমহল কতোটা জটিল মানসিকতায় সিদ্ধ হয়েছে তা বোঝা যাবে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুইটি ঘটনায়। একাত্তর টেলিভিশনে দৈনিক আমাদের নতুন সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাসুদা ভাট্টির প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য আমরা সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা মইনুল হোসেনকে আইনের কাঠগড়ায় শাস্তি পেতে দেখছি। সাধারণ নাগরিকদের বিবেক প্রাথমিক প্রতিক্রয়ায় সায় দিয়েছিলো নারীর প্রতি এমন অবমাননাকর প্রকাশ্য উদ্ধত আচরণের কারণে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি রাজনীতির রাহুগ্রাসে ঢাকা পড়ে গেলে একে ঘিরে নানাবিধ ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। আমরা এখনো বিশ্বাস করি, যতই রাজনীতি থাকুক ঘটনাটি ভবিষ্যতে নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণের বিষয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একই আবহে কিছুদিন আগে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মিস আয়ারল্যান্ড ও মডেল প্রিয়তিকে সরাসরি দেশের এক শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতির বিরুদ্ধে কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির প্রকাশ্য অভিযোগ করতে। দেশের কোথাও নারী বা পুরুষ এখনো অব্দি প্রিয়তির পক্ষে সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করেছেন কী? কিংবা প্রিয়তি নিজেও এই ব্যাপারে প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হননি। মিডিয়ায় প্রিয়তির পক্ষে প্রচারণা চললেও কথিত অপরাধী যদি প্রকৃত অপরাধী হয় তাকে শনাক্ত করে ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই পূর্বক একে বিচারিক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো আলামত দৃশ্যমান নয়। এটা সহজ বোধগম্য বিষয়, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতার বয়স যতো বাড়বে ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা দায়ের লক্ষ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির সংলাপ ততো প্রলম্বিত হবে। কিন্তু নারীর অংকুরিত যৌবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কালো ভ্রমররূপী চরিত্রহীন পুরুষের এই জাতীয় আগ্রাসন কোনোপ্রকার যৌথ সংলাপের ধার ধারে না। পাশ্চাত্যের নারীবাদী আন্দোলনের ‘মি-টু’ শীর্ষক আন্দোলনের হাওয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হয়ে পড়ে রাজনীতি। রাজনীতির বাগানে অসময়ে কোকিল ডাকলেও আমজনতার কারও জীবন যদি ফুলের বাগান হয়, সেখানে বিষধর সাপের আনাগোনা কেউ ঠেকাতে পারেনি। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে দেখা যায় এর সঙ্গে রাজনীতির কালো সাপ গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে।

লেখক : চিকিৎসক ও লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত