প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতারণা বন্ধে বিয়ের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন

মো: রিজওয়ানুল ইসলাম : বিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন বা বৈধ চুক্তি যার মাধ্যমে দু’জন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিয়ের পূর্ব শর্তই হল দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একসাথে থাকতে রাজি হবেন। আর এই রাজি হওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। কিন্তু সবসময় বিয়ের প্রাত্র-পাত্রী একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেন না। যেমন ধরা যাক- সুমনের (ছদ্মনাম) বাড়ি বরিশালের এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু সে চাকরি করে নোয়াখালী শহরের একটি থানা পর্যায়ে। তো সুমনের সেখানে এক তরুণীকে পছন্দ হয়ে যায়। ধরা যাক তরুণীর নাম সুমনা।। সেও সুমনকে পছন্দ করে। যথারীতি তারা বিয়ে করতে চায়। কিন্তু সুমনার পরিবার এ বিয়েতে সম্মতি দেয় না। তখন তারা নিজেরাই বিয়ে করে নেয়। পরে সুমনা জানতে পারে, গ্রামের বাড়িতে সুমনের আগের স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। সুমনার পরিবার রাজি না থাকায়, সুমনের পরিবার সম্পর্কে খুব একটা খোঁজ-খবরও নিতে পারেনি সুমনা। তখন তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। বিয়ের রীতিনীতি এখন কিছুটা কঠিন হয়ে যওয়ায়, বাংলাদেশে বহু বিবাহ অনেকটাই কমে গেছে। তারপরও বিয়ে নিয়ে এ ধরনের প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও কম নয়।

বিয়ে নিয়ে এ রকম প্রতারণামূলক ঘটনা একেবারেই কমে যাবে যদি বর-কনের বিয়ের রেজিস্ট্রিটা হয় অনলাইনে। আর এর জন্য অনলাইন ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পোর্টাল তৈরি করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এ পদ্ধতিতে বর-কনে যখন বিয়ে করতে যাবে তখন অনলাইনে তাদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেটের ফটোকপি (বয়স প্রমাণের জন্য) ও জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি ইনপুট করতে হবে। ফলে বিয়ে রেজিস্ট্রির ঐ ওয়েবসাইটে ঢুকে, বর বা কনের নাম লিখে সার্চ করলেই, আগে তার বিয়ে হয়েছে কিনা বা তার বিবাহ সম্পর্কাদি বিষয়ক সমস্ত তথ্য যে কেউ জানতে পারবে।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্র্রি করা বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রেও বর-কনে বিবাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির কাছে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে বিবাহ নিবন্ধন বই পূরণ করেন এবং ঐ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। তবে অনেকেই এই আইনের ভুল ব্যাখ্যা করেন এবং মনে করেন যে, এই আইনে বহু বিবাহের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কোন পুরুষ কখনোই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। করে থাকলে তার সাজা এক বছরের জেল বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা। অনেক সময় জেল-জরিমানা দুটোই হতে পারে। কিন্তু এর ফলে ঐ ব্যক্তির দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ বা বাতিল হয়ে যাবে না। এছাড়াও প্রথম স্ত্রীকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি প্রথম স্ত্রী কোন অভিযোগ না করে, সেক্ষেত্রে ব্যক্তিটি পার পেয়ে যাবে। অনেক সময় লোকলজ্জা বা সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে প্রথম স্ত্রী অভিযোগও করেন না। বরং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেন।

কিছু নারী অধিকার কর্মী আইনের মধ্যে থেকেই পুরুষের এই বহু বিবাহ আইন সংশোধনে জোর দিচ্ছেন। দ্বিতীয় বিয়েকে অবৈধ বা বাতিল করে পুরুষের বিরুদ্ধে আরো জোরালো শাস্তি দাবি করছেন। তবে আমাদের বর্তমান বিবাহ রেজিস্ট্রার পদ্ধতিতে আসলেই কোন নারী বা পুরুষের বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে জানাটা খুবই কঠিন। কারণ কোন একটি গ্রামের কোন একজন পুরুষ বা নারীর বিয়ে হয়েছে কিনা, কতবার হয়েছে তা অন্য জেলার কোন ব্যক্তির পক্ষে কাগজপত্র ঘেটে বের করাটা খুবই কঠিন একটি কাজ। বর্তমান বিয়ে রেজিস্টার করা হয় শুধুমাত্র নারীর অধিকার আদায়ের জন্য। বিয়ে রেজিস্ট্রির কাগজ থাকলে স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ, দেনমোহরসহ সমস্ত অধিকার আদায় করে নিতে পারে। এমনকি স্বামী মারা গেলেও স্ত্রী তার প্রাপ্য অধিকার পাওয়ার দাবি করতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান বিবাহ আইনে স্ত্রীর অধিকার রক্ষা হলেও, তা ব্যক্তির বহু বিবাহ রোধে খুব একটা কার্যকর নয়। বিবাহ রেজিস্ট্রারের মধ্যমেই পুরুষের বহুবিবাহ রোধ সম্ভব হতো যদি বিয়ের রেজিস্ট্রি অনলাইনে হতো এবং এর জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোন ডাটাবেজ তৈরি করা হতো। আর সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা হতো। এর ফলে বিবাহে প্রতারণাও বন্ধ হতো।

লেখক পরিচিতি : নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত