প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পদোন্নতি ও পদায়ন নেই কৃষি ক্যাডারে

সমকাল :  ঘনবসতির দেশ। আছে নানা প্রাকৃতিক প্রতিকুলতা- বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী আবহাওয়া। প্রতিদিনই কমছে কৃষিজমি। তারপরও খাদ্যশস্য ও মাছ উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষির নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য এখন সারা বিশ্বে উদাহরণ। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগসহিষ্ণু উন্নত শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে এ দেশ। ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনে অভাবনীয় রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি সারা বিশ্বে প্রাকৃতিক মাছ এবং সবজি উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

এ অর্জনের পেছনের কারিগর এ দেশের কৃষক, কৃষিবিদ ও কৃষি গবেষকরা। সরকারের নীতি ও উপকরণ সরবরাহও এ সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে কৃষির উন্নয়নের মূল পথিকৃৎ কৃষক থেকে শুরু করে বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কৃষিবিদরা এখনও এ সাফল্যের সুফল পাননি। সরকারের অন্যান্য সমপদমর্যাদার ক্যাডারের তুলনায় নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত কৃষি ক্যাডাররা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একই বিসিএস ব্যাচে যোগ দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত হয়েছেন। অথচ কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তারা এখনও উপসচিব পদমর্যাদায় (উপপরিচালক) কাজ করছেন। সময়মতো পদোন্নতি হচ্ছে না তাদের। এই ক্যাডার সার্ভিসের ওপরের দিকের লোকবল বাড়ানোর মতো পদ সৃষ্টি না করার কারণেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। গত পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষি ক্যাডারদের পদ আপগ্রেড করার লক্ষ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হয়। এ কমিটি কৃষি ক্যাডারের পদসংখ্যা বাড়ানোর ও পদ উন্নীতকরণের যে সুপারিশ করেছিল, তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব পদমর্যাদার ক্যাডাররা বর্তমানে গাড়ির জন্য ৩০ লাখ টাকার ঋণ পাচ্ছেন। গাড়ি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি মাসে ৪৫ হাজার টাকাও পাচ্ছেন। কিন্তু কৃষি ক্যাডাররা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা গাড়ি ও আবাসিক সুবিধা পেলেও কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তারা বঞ্চিত এসব সুবিধা থেকে। অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা দুই থেকে তিন বছর পর পর পদোন্নতি পেলেও কৃষিবিদরা এক পদে সাত থেকে আট বছর দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। পদায়ন ও নিয়োগ না হওয়ায় ইতিমধ্যে কৃষি ক্যাডারের ১২০০-এর বেশি পদ শূন্য পড়ে আছে। এতে কৃষি খাতে মাঠ পর্যায় থেকে উচ্চস্তরের কাজের সমন্বয় ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি ক্যাডাররা অন্য ক্যাডারদের তুলনায় প্লট বরাদ্দও কম পাচ্ছেন। মোবাইল ভাতাও পাচ্ছেন না তারা।

কৃষি ক্যাডারের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসে পদ শূন্য না থাকলেও পদায়ন হচ্ছে। অথচ কৃষিতে পদ শূন্য থাকার পরও পদায়ন নেই। প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব পদের বিপরীতে তিনগুণ পদায়ন হয়েছে। প্রতিটি স্তরেই অতিরিক্ত পদায়ন হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কৃষিবিদ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সমকালকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে একজন এসি ল্যান্ড যোগ দিয়েও সরকারি গাড়ি পাচ্ছেন। অথচ তার চেয়ে কয়েক ধাপ সিনিয়র কৃষি কর্মকর্তা সরকারি গাড়ি পাচ্ছেন না। প্রশাসনের উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা গাড়ির ঋণ পাচ্ছেন, প্রতি মাসে সার্ভিস খরচ পাচ্ছেন। কিন্তু কৃষি ক্যাডাররা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। কৃষি ক্যাডারদের পদোন্নতিও আটকে আছে দীর্ঘ দিন। এতে হতাশা বাড়ছে তাদের মধ্যে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান সমকালকে বলেন, কৃষি ক্যাডাররা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বৈষ্যমের শিকার। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে শীর্ষ পদের কৃষি ক্যাডারদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ না হলে কৃষি উন্নয়নের গতি কমে আসবে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃক্যাডার বৈষ্যম চলছে। আশা করছি, সরকার এ বৈষ্যম নিরসনে হস্তক্ষেপ করবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস) কৃষিবিদ কবীর আহমেদ সমকালকে বলেন, একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করে একই বিসিএস ব্যাচে চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি চার নম্বর স্কেলের উপসচিব পদমর্যাদায় কাজ করছেন। অথচ তার বন্ধু এখন দুই নম্বর গ্রেডের সুবিধাভোগী অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, বৈষম্যের কারণে সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন কৃষি ক্যাডাররা।

এসব বৈষম্য নিয়ে কৃষি ক্যাডাররা আদালতে দুটি রিট করেছেন (রিট পিটিশন নম্বর ১৯০৭ ও ১৯০৮)। গাড়ি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ায় রিট করেছেন ২৮৮ জন, পদোন্নতি না পাওয়ায় রিট করেছেন ২৬৮ জন। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় রিট হয়েছে আরও দুটি।

বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মহাসচিব কৃষিবিদ খায়রুল আলম প্রিন্স সমকালকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন। কৃষিবিদরাও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় কৃষিতে এ সাফল্য এসেছে। কিন্তু কৃষি ক্যাডাররা সরকারের অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিস থেকে সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য ও অবহেলার শিকার।

মহাসচিব খায়রুল আলম আরও বলেন, সামাজিক ও আর্থিকভাবে আন্তঃক্যাডার বৈষ্যম দূর করা জরুরি। সময় মতো কৃষি ক্যাডারদের সমমর্যাদার ক্যাডারদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি দিলে কৃষির সব স্তরের কাজে সমন্বয় ও গতি আসবে। কৃষি আরও সাফল্যের শিখরে উঠবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ