প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ধারাবাহিক সংলাপের বিকল্প নেই

সালেহ্ রনক: তিলকে তাল করতে আমরা বেশ পারঙ্গম, কখনো কখনো তালকে তিলের চেয়ে ক্ষুদ্র করতে আমরা দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকি। হঠাৎ করেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে সংলাপের উদয় হলো। বলতে গেলে সবাইকে চমকে দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐকফ্রন্টের সংলাপের জন্য প্রেরিত চিঠির বিপরীতে তাদেরকে নৈশভোজসহ আলোচনার জন্য ডাকলেন। দেখে শুনে মনে হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন এমন একটি আয়োজনের অপেক্ষায় ছিলেন। কেননা দলের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের একদিন আগেও বলেছেন, কোন সংলাপের প্রশ্নই আসে না।

রাজনৈতিক রীতিনীতিতে সংলাপ উত্তম একটি পন্থা। দুই বা তার অধিক পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের জমাটকৃত বরফ গলার জন্য এরচেয়ে ভালো বিকল্প নেই। সুতরাং সংলাপকে স্বাগত জানানোই শ্রেয়। কিন্তু ঐকফ্রন্টকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পর থেকেই শুরু হয়ে গেল তিলকে তাল আর তালকে তিল করা। একপক্ষ বলছেন, সংলাপের জন্য ডেকেছেন, বিপরীতে আর একপক্ষ বলছেন, সংলাপ নয় আলোচনার জন্য ডেকেছেন। অথচ সংলাপের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আলোচনা বা কথাবার্তা। অর্থহীন সব যুক্তি তর্কে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে উঠল। সাথে যোগ হলো খাবারের তালিকা।এক্ষেত্রে একপক্ষ বলছেন সংলাপের জন্য গিয়ে খাওয়া ঠিক হবে না, অন্যপক্ষ ১৭ পদের খাবার খাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে রসালো আলোচনায় মশগুল। সমালোচনাকারীরা ভুলে গেছেন কাউকে আলোচনা কিংবা সংলাপ যে কারণেই ডাকা হোক না কেন, কথাবার্তার সাথে সাথে আতিথেয়তার ও বিষয় থাকে। কারণ কেউ যদি আতিথেয়তার মুগ্ধ হয়ে দাবিদাওয়া তুলে ধরতে সংকোচ করেন, সেটা তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা, তার কোন সমাধান নেই।

অনেক দিক বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল এই সংলাপ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ও আইনজ্ঞ ডা. কামাল হোসেন জ্ঞানের বিবেচনায় যতখানি সমাদৃত ভোটের রাজনীতিতে ততটাই ব্যর্থ ও সমালোচিত। তারপরও সকল নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে স্বল্প সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি হয়ে ওঠেন। এছাড়া সরকারের পুরোটা সময় তিনি বলতে গলে প্রায় অদৃশ্য থাকেন। একারণেই সমালোচকরা ডা. কামালের ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংলাপ পর্যন্ত সকল বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখে আসছেন এবং ভালো সব উদ্যোগগুলোকেও রসালো সব আলোচনায় পরিণত করেছেন। রাজনৈতিক দল বিএনপির কথা আলাদা, আজকাল তারা যেখানেই একটু আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে, কথা বলার একটা মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছে তাতেই মহাখুশি হচ্ছে। তাই ডা. কামালসহ অন্যদের নিয়ে তারা ভীষণ খুশি। তারাও আহ্লাদিত হয়ে একদম ঠকেনি , জাতীয় ঐকফ্রন্টে শামিল হওয়ার কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে বসার সুযোগ পেয়েছে।

এবারের সংলাপের সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে দীর্ঘ একযুগ পর মুখোমুখি হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের সংলাপটি ছিল এক অর্থে আওয়ামী লীগ বনাম দলছুট আওয়ামী লীগ এর মিলনমেলা তাতে অন্যরা যেন গেছেন সহযাত্রী হয়ে।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয়। ১৪ দলের শরিক ছিল গণফোরাম। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর ১৪ দলের সভায় শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের দেখা হয়।
২০০৬ সালে রাজধানীর পল্টন ময়দানে ১৪ দলের সমাবেশে একই মঞ্চে বক্তব্য রেখেছিলেন শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেন। পরে ১৪ দল ছেড়ে যায় গণফোরাম। এরপর শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেন মুখোমুখি হননি। ১২ বছর পর ১ নভেম্বর সংলাপের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ও কামাল হোসেন আবার মুখোমুখি হলেন। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু অনুসারী আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজনীতিতে এটা নতুন অগ্রগতি এবং অবশ্যই এর একটা তাৎপর্য আছে।

বাংলাদেশ রাজনীতিতে সংলাপ হচ্ছে এটাই একটি সুখবর। তাই সকল পক্ষের উচিত সংলাপকে স্বাগত জানিয়ে চলমান রাখা। প্রতিটি সংলাপ থেকেই কিছু না কিছু প্রাপ্তি থাকে। তাই সংলাপ চালিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে একে অন্যের মুখ দেখাদেখি ও কথা বন্ধ থাকায়ও ছেদ পড়ল এবারের সংলাপে। জাতীয় রাজনীতিতে এর গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী বলেই মনে করি। সংলাপ প্রশ্নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘সংবিধানসম্মত সব বিষয়ে আলোচনার দ্বার সর্বদা খোলা আছে।’ তার অর্থ হচ্ছে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে যেতে রাজি নয়। তার মানে এই নয় যে সকল পথ রুদ্ধ। নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনে সংবিধানসম্মত একাধিক বিকল্প আছে এবং সেদিকে ঐক্যফ্রন্টসহ অনান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পিছনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই, উচিতও হবে বলে মনে করছি না।

গতকাল ১ নভেম্বর সরকারের সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চলা সংলাপে অর্জিত সাফল্যকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া সাত দফাভিত্তিক সংলাপ প্রস্তাব ক্ষমতাসীন দল নাকচ করে দেওয়ার পরপরই সংলাপের মধ্য দিয়ে আবার তা গ্রহণ করেছে। আমি মনে করি এখানেই ঐক্যফ্রন্ট তাদের প্রথম সাফল্য অর্জন করেছে। গতকালের সংলাপে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের অগ্রগতি ও চলমান উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে সকলের সাথে একযোগে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন,রাজনৈতিক দল বিএনপিও তার বাইরে নয়। সংলাপে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, একটি সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য যা যা করার দরকার সব করবেন। তিনি এও বলেছেন, কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছে তাঁর নেই। ১ নভেম্বর শুরু হওয়া সংলাপের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হচ্ছে -ক) এখন থেকে শুরু করে নির্বাচন পর্যন্ত সকল প্রকার রাজনৈতিক মামলা বন্ধ থাকবে। খ)প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার তালিকা চেয়েছেন ।গ) নির্বাচনকালীন সময়ে বিদেশী প্রতিনিধিসহ ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের অবাধ বিচরণ থাকবে। ঘ)ঐক্যফ্রন্ট নির্বিঘ্নে সভা সমাবেশ করতে পারবে।

এখন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সংলাপকে ধারাবাহিকতায় রূপ দিতে হবে। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, একদিনের সংলাপে সবকিছু অর্জন সম্ভব নয়। এদিকে ডা. কামাল হোসেন বলেছেন, সংলাপ ভালো হয়েছে। তিনি আবারও সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ঐক্যফ্রন্ট তাদের সাত দফা দাবি আদায়ের ব্যাপারে স্বাভাবিক কর্মসূচী পালন করে যাবেন। ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, সংলাপে প্রধানমন্ত্রী বেশ আন্তরিক ছিলেন এবং সময় নিয়ে কথা শুনেছেন, আলোচনার জন্য যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। এই বিষয়গুলোকে অর্থবোধক করে তুলতে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে নেয়া ছাড়া ভালো বিকল্প এই মুহূর্তে হাতে নেই। সংলাপ চলমান থাকলেই হয়তো বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না কিংবা তাদের দলের প্রধান নেতৃত্বকে কারামুক্ত করা সম্ভব হবে না তবে সকলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের দ্বার উন্মুক্ত হবে। এই মুহূর্তে দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

গতকাল ২ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা সংলাপে যুক্তফ্রন্ট তাদের সকল দাবীদাওয়া তুলে ধরেছে। সংলাপ শেষে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে, ওবায়েদুর রহমান বলেছেন, গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে, যুক্তফ্রন্টের অংধিকাংশ দাবী মেনে নেয়া হয়েছে। গতকালের সংলাপে উভয়পক্ষ কিছু বিষয়ে একমত হয়েছে গতকালের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হচ্ছে- নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যুক্তফ্রন্টকে আশ্বস্ত করেছেন, তফসিল ঘোষনার পর মন্ত্রী-এমপিদের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে চলে যাবে ও নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনে আংশিক ঐক্যমতে। এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে সকল প্রকার ইগোকে দূরে রেখে সংলাপকে কার্যকর করে তোলা। তফসিল ঘোষনার পরও চলমান সংলাপকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। যদি এই সংলাপ ফলপ্রসূ ও অর্থবহ হয় তাহলে সারা দেশে একটা স্বস্তির বাতাস বইবে। কারণ এই সংলাপের ওপর বহুলাংশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের গুণগত মান এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। দেশের মানুষ আর নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সহিংসতা দেখতে চায় না। দীর্ঘসময় ধরে উৎসব মুখর পরিবেশে ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পেতে চায়।

সংলাপের আগে ও পরে দৃশ্যমান কিছু রাজনৈতিক শিষ্টাচার আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রথম দিকে ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে কিছুটা সমালোচনা করলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একে স্বাগত জানিয়েছেন। এর বিপরীতে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ও স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতের¡ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিও একটি ভালো অগ্রগতি বলে আমরা মনে করি। যার যতটুকু প্রাপ্য তা তাকে দিতে হবে।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং একটি স্থিতিশীল সরকার, সংসদ ও সর্বোপরি রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজমান রাখতে হলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের বিকল্প নেই। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে এসে এখনো আমরা প্রতিবার নির্বাচন করতে এসে হোঁচট খাচ্ছি। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয় তাই পিছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত। দেশের শান্তিকামী মানুষ নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে চায় আর সংলাপই পারে প্রাকনির্বাচনী পরিবেশ উন্নত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে, যেখানে সরকারের দায়িত্বই বেশি।

লেখক : শিক্ষক, সমাজকর্মী