প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্যালাইন ফর্মুলা, ধর্মঘট এবং ল্যান্ডস্কেপ

কাকন রেজা

স্যালাইন বানানোর প্রক্রিয়াটিতো সবারই জানা। আধা লিটার পানি, এক মুঠো গুড়, তিন আঙুলের এক চিমটি লবন, সব মিলিয়ে দিন একটি ঘুটা। তাতেই তৈরি হয়ে যাবে স্যালাইন, যা ডায়রিয়ার মহৌষধ। স্যালাইন বানানোর এই ‘ঘুটা মারা’ ফর্মুলা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে খেটে যায়। এই ফর্মুলাকে ব্যবহার করে নানা বিপদ থেকেও উত্তরণ সম্ভব হয়ে উঠে।

হালের শ্রমিক ধর্মঘট বিষয়ে বলি। অনেকেই পোড়া মবিলের কালি মাখানো এই ধর্মঘট বিষয়ে পর্যালোচনা করেছেন, লিখেছেন। এসব অনেক লেখাতেই উঠে এসেছে শ্রমিক রাজনীতির সাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা, বামদলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়। অনেক নেতার নাম ধরে বলা হয়েছে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার কথা। অর্থাৎ এসব লেখার মাধ্যমে বিষয়টিকে সার্বিক করা হয়েছে। অথবা ‘সার্বজনীন’ করার কথাও বলতে পারেন। মোট কথা পুরো বিষয়টিকে সরলিকরণ করে দোষ-গুনের ভাগী করা হচ্ছে সবাইকে। ফোকাসটিকে নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ব্রড ক্যানভাসে। ফলে পুরো চিত্রটি পরিণত হচ্ছে ‘অ্যাবস্ট্রাক্টে’। আর ‘অ্যাবস্ট্রাক্টে’র গোলকধাঁধায় পড়ে চক্কর কাটছে সমাধানের মূল বিষয়টি।

এই ‘চক্কর’টাই হলো স্যালাইন ফর্মুলা। আধা লিটার খানের সাথে, এক মুঠো বিশ্বাস আর এক চিমটি রাঙা মিশিয়ে দাও, তারপর দাও ঘুটা। হয়ে গেলো স্যালাইন এবং সমস্যা আড়ালের মহৌষধ। মানুষ ভাবতে থাকবে ঠিকই তো! একজনকে দোষ দিয়ে লাভ কী, সবাইতো দোষী। আর এই ভাবতে থাকার ফাঁকে মূল দৃশ্যটি হাওয়া। ছবির ভাষায় বলা যায়, পোর্ট্রেট থেকে ল্যান্ডস্ক্যাপে পদার্পন। পোর্ট্রেট মানে সুনির্দিষ্ট বিষয়, ল্যান্ডস্কেপ হলো বিষয়ের সমষ্টি। এই পদার্পনের সুবিধা হলো সুনির্দিষ্ট বিষয়টি তথা সমস্যাকে সমস্যার সমষ্টি বানিয়ে ফেলা, যা প্রায় সমাধান অযোগ্য। আর ‘স্যালাইন ফর্মুলা’ প্রয়োগের মাজেজাটি এখানেই।

পোর্ট্রেট আর ল্যান্ডস্ক্যাপের মধ্যে যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে যুক্তি ও তর্কের মধ্যে। যুক্তি হলো সুনির্দিষ্ট আলোচনা, আর তর্ক হলো সরলিকরণ। বিতর্ক তখনই স্বার্থক হয় যখন তর্কের সাথে যুক্তির সমন্বয় ঘটে। অর্থাৎ আলোচনাটা আগায় যুক্তিটাকে ঘিরে। উদাহরণ দিই। হালের শ্রমিক ধর্মঘটে একটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেয়ায় সাত দিন বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনাটি বর্বরতার চুড়ান্ত এবং অবশ্যই শাস্তিযোগ্য। একটি মানব সন্তানের চিকিৎসার অধিকার মৌলিক, সে অপরাধী হলেও। আর এই অধিকার প্রাপ্তিতে বাধা দেয়া সংবিধান লংঘনের সামিল। মৌলিক অধিকার প্রাপ্তিতে যেকোনো বাধাই শাস্তিযোগ্য। এটাই হলো যুক্তি।

এখন তর্ক কোনটা সেটা বলি। এ অবস্থায় যদি কেউ বলেন, ‘শিশু হলো ফেরেশতার মতন, তার কোনো পাপ নেই। সে যতই বড় হবে ততই তাকে পাপ স্পর্শ করবে। অ্যাম্বুলেন্সে যে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে, সে নিষ্পাপ। সে হিসাবে তার স্বর্গ প্রাপ্তি নিশ্চিত। বড় হলে যা সম্ভব ছিলো না। সুতরাং যারা শিশুটির স্বর্গ প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছেন, তাদের এমন কর্মের জন্য অবশ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য।’ এটা হলো তর্ক। এ ধরণের কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হন। তর্কের কাজই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং এর মাধ্যমে অন্যায়কে জাস্টিফিকেশন দেয়া। যেমন: অন্যের অতীতের অন্যায়ের কথা তুলে বর্তমানের অন্যায়কে জাস্টিফিকেশন দেয়া হয়। কিংবা অন্যায়কারীর পূর্বের ভালো কাজের উদাহরণ দিয়ে দায়মুক্তি দেয়া হয় বর্তমানের খারাপ কাজকে। অন্যের অতীত অন্যায়ের তুল্যতা কিংবা নিজ অতীতের ভালো কাজ, হাল অন্যায়ের দায়মুক্তি দেয় না, দেয়া উচিত নয়। অথচ দেখা যায় এক শ্রেণির মানুষ, সব সময় সেই চেষ্টাই করেন। প্রয়োগ করেন স্যালাইনের ‘ঘুটা ফর্মুলা’। ঘুটা মেরে সব দোষ তাসের মতন বেটে দিতে চান। অন্যায় ঢাকার প্রচেষ্টা আর অন্যায় দুটোই অন্যায্য এবং শাস্তিযোগ্য। এমন অন্যায্যতায় ন্যায় প্রাপ্তির আকাংখা হোঁচট খায়, মানুষ ক্রমেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। আর এই বিক্ষুব্ধতার বিষয়টি হলো আগ্নেয়গিরির মতন। ভেতরের আগুন তৈরি বিস্ফোরণের জন্য, উদগিরণের আগে যার ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব হয় না, বোঝা যায় না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত