প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবেগ ও তার শক্তি

ডা. ফোরকান উদ্দিন আহমেদ : আবেগ, অনুভূতি ও ভয় মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রত্যেকটি মানুষ এই প্রবৃত্তিগুলোর দ্বারাই পরিচালিত হয়। রাগ, ভয়, ভালোবাসা, সমবেদনা, স্নেহ- আবেগের এই স্তরগুলোর মাধ্যমে আসলে মানুষের মনের অবস্থাটা বুঝা যায়। অনেক সময় এগুলোর প্রকাশ শারীরিকভাবেও ঘটে। যেমন: রেগে গেলে অনেকের চোখ-মুখ লাল হয়ে যায় বা ভয় পেলে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এগুলো দিয়ে মানসিক অবস্থান বুঝা গেলেও, এদের জন্ম কিন্তু মস্তিস্কেই। আবেগ দিয়ে অন্যকে যাচাই করা গেলেও, একেক মানুষের আবেগ একেক রকম হতে পারে। প্রকাশেও থাকে ভিন্নতা। আবেগীয় এই ব্যাপারগুলো জিনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারাও প্রভাবিত হতে পারে। যেমন: রাগী বাবা-মায়ের সন্তানও রাগী হতে পারে। তবে উল্টোটাও হতো পারে।

তবে এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও পরিবেশেরও প্রভাব পড়ে। আবেগ মানুষের জীবনের বেশিরভাগটাই নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। যুদ্ধে আমরা জয় পেয়েছি শুধুমাত্র মনের জোরে। আর এই জোর এসেছে দীর্ঘদিনের শোষন, বঞ্চনা ও না পাওয়ার বেদনার মতো আবেগীয় বৈশিষ্টের কারণেই। প্রায় সব আবেগেরই শারীরিক প্রকাশ রয়েছে। মজাদার খাবার দেখলে খেতে ইচ্ছে করে বা মুখে লালা চলে আসে। ভালোবাসার কথা শুনলে মানুষ লজ্জা পায় বা শরীর শিহরিত হয়। এই প্রকাশগুলো খুবই সাধারণ। তবে অনেক সময় আবেগের প্রকাশ মারাত্বক হতে পারে। অনেক সময় সেটা কোন শারীরিক অসুস্থতার কারণও হতে পারে। ধরা যাক, আমাদের সমাজেই বসবাসরত এক নারী- মিসেস স্বপ্নার কথা। বিয়ের পর চারবার তার মিসক্যারেজ হয়। পঞ্চমবার সে সাহায্য নেয় মনোচিকিৎসকের। স্বপ্নার সাথে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, স্বপ্নার ছোটবেলার কথা। ছোটবেলায় স্বপ্না নানী-দাদী ও বয়স্কদের কাছ থেকে গর্ভধারণ ও বাচ্চা জন্ম দেয়ার সময়ের যন্ত্রণাদায়ক কষ্টের কথা শুনে শুনে বড় হয়েছে। ডাক্তার তাকে কোন ওষুধ না দিয়ে, শুধু কথা বলেই তার ভয় দূর করছে। ফলে পঞ্চমবার সে সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে সক্ষম হয়।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন যে, গর্ভকালীন মায়েদের শরীরে বিশেষ এক হরমোন তৈরি হয়। যার ফলে বাচ্চা জন্ম দিতে মায়েদের সুবিধা হয়। যে নারীদের মিসক্যারেজ হয়, তাদের জন্য তাই ওষুধের চেয়ে কাউন্সেলিং বেশি দরকার হয়। এছাড়া পরিস্থিতির হঠাৎ পরিবর্তনেও মানুষ অসুস্থ হতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে বাস্তুহারা, প্রিয়জন বা চাকরি হরানো বক্তিদের চারজনের মধ্যে তিনজনই মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

অনেক সময় খুব সামান্য কারণও মানুষের মধ্যে ভীতি আনে। এই ভয়ও একটা আবেগ। যেমন: কোন পর্যটক যদি বারবার বাইরের খাবার বা পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকেন, তাহলে বুঝে হবে, তিনি আসলে অপরিচিত পরিবেশ বা অচেনা জায়গায় রাত কাটাতে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি সামান্য ঠান্ডা লাগা বা সর্দি কাশির কারণও মানসিক হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো-সাইক্রিয়াটিস্টরা কি এসব মানসিক বা আবেগীয় সমস্যার সমাধান করতে পারে?

গবেষণা বলে, হ্যা পারে। আর একারণেই বর্তমানে কিছু মেডিক্যাল কলেজ কিছু শর্ট-কোর্সের ব্যবস্থা করেছে। যার ফলে মনোরোগ নিয়ে স্নাতকের পর যে কেউ এই কোর্সগুলো করে কাউন্সেলিং-এর কাজ করতে পারে। বেশিরভাগ চিকিৎসকদেরই রোগীর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার সময় থাকে না। কিন্তু সাইক্রিয়াটিস্ট বা মনোবিদরা খুব সহজেই রোগীদের সাথে কথা বলে, তাদেরকে আশ্বস্ত করতে পারে যে, তারা ভালো হয়ে উঠবে। আর সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিরাও ধীরে ধীরে তাদের মনের অপ্রকাশিত কথাগুলো বলে হালকা হতে পারে।

আবার আবেগের বহু ধ্বংসাত্মক চিত্রও রয়েছে। লোভ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশ জয়ের আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষমতার লোভ থেকেই যুগে-যুগে, দেশে-দেশে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, প্রথম শতকের রোমান সম্রাট নেরভা’র মৃত্যু হয়েছিলো অতিরিক্ত রাগের কারণে। মৃত্যু খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা হলেও, একটি মৃত্যুুর ঘটনা তার আশপাশের মানুষের জীবনে নিয়ে আসতে পারে অনেক ধরনের আবেগীয় সমস্যা। প্রিয়জনের মৃত্যুতে অনেকে কিছুদিন কান্নাকাটি করেই স্বাভাবিক হতে পারে। আবার অনেকে বছরের পর বছর প্রিয়জনকে হারানোর দু:খে কাতর থাকে। অনেকে ব্যর্থতাকে মেনে নিতে না পেরে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেয়। এসবই হয় আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে।

তবে আবেগের আলাদা এক শক্তি আর তেজও রয়েছে। এই শক্তিতে বলিয়ান হয়েই যে কেউ একজন নামকরা চিকিৎসক, কবি, পাইলট বা বিশ্বখ্যাত নেতা হতে পারে। তবে এই আবেগ হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। তাই আবেগের নিয়ন্ত্রণকেই সুন্দর ও সুস্থ্য জীবনের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়।

লেখক পরিচিতি : কলামিষ্ট ও গবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ