প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সভ্যতা পরিণত হচ্ছে বর্বরতায়

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার : আদালতের কর্মপরিধি শেষ হয় সাজা বা খালাসের মাধ্যমে। অপরাধ বিশেজ্ঞদের মতে, কারাগারকে শাস্তির বা সাজা ভোগের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা না অপরাধীকে শুদ্ধ করার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। অপরাধীদের ‘শুদ্ধ’ করার ফলে পৃথিবীর অনেক কারাগার পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ সেখানে অপরাধীকে শুদ্ধ করার পদ্ধতি নিশ্চয় গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কারাগার কারাকর্তৃপক্ষের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। যার জন্য ছোট অপরাধের জন্য জেল খেটে ভয়ঙ্কর অপরাধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ জন্য বাংলাদেশে কোনো গবেষণা নেই, অন্যদিকে সরকার প্রতিহিংসাপরায়ন বিধায় দিন দিন জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, জাতি দিকনির্দেশিত হচ্ছে উল্টোপথে।

আমাদের দেশে কারাগারগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা ভুক্তভোগী সকলেই জানেন। তাছাড়া নিম্ন প্রকাশিত সংবাদ থেকে আরো তথ্য পাওয়া যায় যা থেকে সহজেই অনুমেয় যে, জাতির পায়ে কুঠারাঘাত করার জন্য দায়ী কে? গত ২৯/১০/২০১৮ তারিখে একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিম্নরূপ : ‘গত শুক্রবার দুপুরে ভৈরবে রেল পুলিশের হাতে জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মাদকসহ আটকের পর এ প্রশ্ন উঠেছে। তার হেফাজত থেকে উদ্ধার করা টাকার উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস নিজেও পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন ওই টাকার মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা ছাড়া বাকি সব টাকা কারাগারের বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধ উপায়ে অর্জন করা। তিনি এও বলেছেন, ওই টাকার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি পার্থ কুমার বণিক ও চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেলা সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের ভাগও রয়েছে। তবে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এ দুই কর্মকর্তা। জানা গেছে, বাইরে থেকে কোনো স্বজন বন্দির কাছে ৫০০ টাকা পাঠালে ভেতরে সেই টাকা হয়ে যায় ৪০০ টাকা। কমিশন বাবদ ১০০ টাকা কারা ক্যান্টিনে কেটে নেওয়া হয়।

বন্দির সাথে স্বজনদের অফিস সাক্ষাৎ নামে আদায় করা হয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। কারা হাসপাতালে থাকতে হলেও বন্দিকে গুণতে হয় প্রতিমাসে ১২-১৫ হাজার টাকা। বন্দি ভয়ঙ্কর আসামিদের রোগী সাজিয়ে কারা মেডিকেল ও বাইরের হাসপাতালে নিয় গিয়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এভাবে প্রতিমাসে বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধভাবে আয় করা লাখ লাখ টাকা ভাগ বাটোয়ারা হয় কারা কর্মকর্তাদের মাঝে। জামিনে মুক্তি পাওয়া একাধিক আসামি জানায় দুর্নীতির খাতগুলো হচ্ছে বন্দিদের সাথে স্বজনদের সাক্ষাৎ, বন্দি বেচাকেনা, খাদ্যপণ্য সরবরাহ, মাদক সরবরাহ, মোবাইলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া, ক্যান্টিনে দ্বিগুণ দামে খাবার বিক্রি, টাকার বিনিময়ে হাজতিকে হাসপাতালে রাখার সুবিধা, বন্দির কাছে টাকা পাঠানো ইত্যাদি। চট্টগ্রাম কারাগারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, ধনী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের বন্দিকে কারা হাসপাতালে রাখা হয় টাকার অংক বুঝে। কয়েদিরা বন্দিদের কাছ থেকে এককালীন ও মাসিক হারে চাঁদা আদায় করেন। সময়মতো চাঁদা না দিলে হাজতিরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।’

এ ঘটনা শুধু চট্টগ্রামের কারাগারের নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের কারাগারের চিত্র। কারাগারের প্রধান গেইটে লেখা রয়েছে যে, ‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’। অথচ সকল প্রকার দুর্নীতির সাথে কারা কর্তৃপক্ষ জড়িত। কারাগারগুলো মাদক সেবনের নিরাপদ স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুষ ও দুর্নীতি, কিন্তু বিচার হয় শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা যাবে না মর্মে সরকার আইন পাস করেছে। কারণ জনগণকে শোষণ করাতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই, তবে যেকোনো অবস্থায় সরকারের প্রতি অনুগত থাকলেই হলো। বিরোধীপন্থীদের নিপীড়ন, নির্যাতন, ন্যায্য অধিকার থেকে যতোটুকু বঞ্চিত করা যায় তার ওপরই নির্ভর করে কোন আমলা সরকারের প্রতি কতোটুকু অনুগত। যেখানে গণতন্ত্র থাকে না সেখানে আমলাতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং আমলাদের দুর্নীতি রেওয়াজে পরিণত হয়। আমলাদের নিয়ন্ত্রক সরকার এবং বিরোধী দলীয়দের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করতে পারলেই পোক্ত হয় আমলাদের আমলাগিরি বর্তমানে বাংলাদেশে তাই চলছে।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ