প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খালেদা জিয়াকে কি প্যারোলে মুক্তি দেয়া সম্ভব?

তাসমিয়াহ নুহিয়া আহমেদ : এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে, পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন বিশেষ আদালত। ৭৩ বছর বয়সী বেগম জিয়াকে “গুরুতর অসুস্থ” অভিহিত করে জুন মাসে তাঁর আইনজীবীরা মানবিক বিবেচনায় তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার আবেদন করেছিলেন। সে সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছিলেন, এটা হবে দেশের প্রচলিত কারাবিধির বড় ধরণের লঙ্ঘন। “বাস্তবতা হচ্ছে খালেদা জিয়া এখন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করছেন…. এমন কয়েদিদের ক্ষেত্রে জেল কোড বা কারাবিধি প্রযোজ্য। কারাবিধি অনুযায়ী, শুধুমাত্র বিশেষ জরুরি ক্ষেত্রেই প্যারোলে মুক্তি সম্ভব”, আইনমন্ত্রী বলেছিলেন। ৩০ অক্টোবর বেগম জিয়া আরেক দফা আইনী লড়াইয়ে পরাস্ত হন। হাই কোর্ট ডিভিশন, জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় তাঁর সাজা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করে দেন।

এ অবস্থায়, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির উপায় হিসেবে প্যারোলে মুক্তির সম্ভাব্যতা, আলোচনার দাবি রাখে।

সাজাপ্রাপ্ত কোন আসামীকে নজরদারিতে রেখেই শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোকালয়ে মুক্তভাবে চলাফেরার সুযোগ দেয়াকেই এক কথায় প্যারোলে মুক্তি বলা যায়।

দণ্ড প্রাপ্ত বা অভিযুক্ত আসামীকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়া বিষয়ক অধ্যাদেশ- প্রবেশন অফ অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স। এই অধ্যাদেশ নিয়ে একটা ভুল ধারণা আছে যে, এটা কেবলমাত্র প্রথমবারের মত এবং দুই বছরের কম সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বাস্তবে এই শর্তগুলো শুধুমাত্র অধ্যাদেশটির ৪ নম্বর ধারার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, অধ্যাদেশের পাঁচ নম্বর ধারায় আদালতকে স্পষ্টভাবেই সেই ক্ষমতা দিয়েছে যাতে কোন দন্ডিত ব্যক্তিকে তিন বছর পর্যন্ত অন্তরবর্তী মুক্তির আদেশ দেয়া যায়। তবে, ২০০৬ সালের আব্দুল খালেক বনাম হাজেরা বেগম ও অন্যান্য মামলার রায়ে উল্লেখ্য অধ্যাদেশের পাঁচ ধারার সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অধ্যাদেশটির চার ধারায় বলা হয়েছে, আগে দণ্ডিত হননি এমন কোন ব্যক্তি যদি দুই বছরের কম কোন দণ্ডে দণ্ডিত হন এবং যদি তাঁর বয়স, স্বভাব, শারীরিক, মানসিক অবস্থা, অপরাধের ধরণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে যদি আদালত সঠিক মনে করেন তবে তাকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য প্যারোলে মুক্তির রায় দিতে পারেন।

তবে একই অধ্যাদেশে ৫(১) ধারায় আছে, কোন পুরুষ যদি দণ্ড বিধির ৬ ও ৭ অধ্যায়ের অন্তর্ভূক্ত কোন অপরাধ বা ২১৬এ, ৩২৮, ৩৮২, ৩৮৬, ৩৮৭, ৩৮৮, ৩৮৯, ৩৯২, ৩৯৩, ৩৯৭, ৩৯৮, ৩৯৯, ৪০১, ৪০২, ৪৫৫ ও ৪৫৮ ধারায় বর্ণিত অপরাধ না করে থাকেন, কিম্বা যদি তিনি মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডে দন্ডিত না হন, তাহলে তাঁর বয়স, স্বভাব, শারীরিক, মানসিক অবস্থা, অপরাধের ধরণ ইত্যাদি বিচার করে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে অন্তর্বর্তী মুক্তির আদেশ দিতে পারেন আদালত। নারীদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তা কেউ এই ধারার আওতার বাইরে। ২০১০ সালের তারেক রহমান বনাম রাষ্ট্রপক্ষ ও অন্যান্য মামলায় আসামিকে বিচার কাজ শেষ হবার আগেই অসুস্থার কারণে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার আদেশ হয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০০৮ সালে আটকাবস্থা থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়েছিলেন।

২০১৪ সালে আলোচিত তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্তও দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলো তাঁর মায়ের লাশ দেখার জন্য।

এসব বিবেচনায় নিলে বলাই যায়, বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে।

লেখক পরিচিতি : নির্বাহী সম্পাদক, ডেইলি আওয়ার টাইম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ