প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পরিকল্পনায় নেই, তবুও সফটওয়্যার পার্কে ডাটা সেন্টার!

প্রিয়.কম : নিজ সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই পার্কের মূল অবকাঠামো পরিকল্পনায় চারটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কথা ছিল। কিন্তু সেখান থেকে সরে এসে ডাটা সেন্টার স্থাপনে অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।

দেশীয় ও স্থানীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মক্ষেত্র শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। চারটি ক্ষেত্রে (কম্পিউটারের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশ-বিদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারবে এই হাইটেক পার্কটিতে।

ওই চারটি বিষয়ের বাইরে পার্কটিতে অন্য কোনো ধরনের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের কথা ছিল না মূল অবকাঠামো পরিকল্পনায়। এরপরও ‘ফেলিসিটি বিগডাটা টু লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ডাটা সেন্টার স্থাপনের সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি।

হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাদের কাছে ডাটা সেন্টার স্থাপনের আবেদন সম্পর্কিত একটি চিঠি এসেছে। এ অনুযায়ী একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাইটেক পার্কটি ডাটা সেন্টার স্থাপনের উপযোগী কি না, তা যাচাই করবে ওই কমিটি। কমিটির দেওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই এর পঞ্চম তলার কিছু অংশে কাজ শুরু করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গেটের সামনে লাগিয়ে দিয়েছে ফেলিসিটির লোগো সংবলিত ব্যানার। ভেতরে রিসিপশনসহ অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরিরও কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ফেলিসিটির মূল পণ্য ডাটা সেন্টার, সফটওয়্যার নয়।

ফেলিসিটির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে দেখা যায়, যশোর হাইটেক পার্কে টায়ার ৩ ডাটা সেন্টার করার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চার হাজার বর্গফুট স্থানে সম্ভাব্য ৪০০ র‍্যাক স্থাপন করা হবে।

ডাটা সেন্টারের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফাইবার অ্যাট হোম নামের প্রতিষ্ঠানের চিফ টেকনোলজি অফিসার সুমন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতি শেষ হয়ে রয়েছে। মিনিস্ট্রি (মন্ত্রণালয়) থেকে একটি পারমিশনের জন্য আমরা ওয়েট করছি। ওটা দিলেই আমরা কাজ শুরু করব।’

‘যেখানে ফেলিসিটির ব্যানার ব্যবহার করে ভেতরে ভেতরে কাজ চলছে, সেখানে ডাটা সেন্টার করতে অনুমতি দেবে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ?’

‘আমরা তো অবশ্যই আশা করি। আশা করি দেখেই আমরা ইকুইপমেন্ট (যন্ত্রংশ) সিলেক্ট করেছি। পারমিশন (অনুমতি) নিয়ে ঝামেলা হবে আশা করি নাই প্রথমে। তারা অনুমতি না দিলে তো আর করতে পারব না। তাই না?’, উত্তরে বলেন সুমন।

অনুমতি না দিলে ফেলিসিটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ঘর ভাড়া করেছি। ডাটা সেন্টার করা হবে বলেই ঘর ভাড়া করেছি আমরা। ডাটা সেন্টার করব বলেই ঘর ভাড়া দিচ্ছি আমরা। ডাটা সেন্টার না করতে দিলে ইকুইপমেন্ট ইনপুট করতে পারব না আমরা। আর ইকুইপমেন্ট না ইনপুট করতে পারলে ডাটা সেন্টার বানিয়ে আমার লাভটা কী?’

‘আমরা বিষয়টির জন্য এক বছর ধরে অপেক্ষা করছি। ওইটার পারমিশন, সার্টিফিকেটের জন্য অ্যাপ্লাই করেছি। উই স্পেন্ড লট অব মানি ফর দ্যাট (আমরা এর জন্য অনেক অর্থ খরচ করেছি)।’

যশোর সফটওয়্যার পার্ককে কেন বেছে নেওয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জিওগ্রাফিক্যালি (ভৌগোলিকভাবে) যশোর ডাটা সেন্টার করার জন্য একটি ভালো জায়গা। যশোরে যদি করতে হয়, তাহলে যশোর হাইটেক পার্কে করা যায়। কারণ হাইটেক পার্কের যে অ্যাডভান্টেজ রয়েছে, তাতে খরচের দিক থেকে সাশ্রয় হবে।’

হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে আসা আবেদন অনুযায়ী, এই ডাটা সেন্টার প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছে দেশের বৃহত্তম বিপিও এবং কল সেন্টার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ডিজিকন টেকনোলজিস লিমিটেড, লাইসেন্সধারী আইএসপি ও আইপিটিএসপি অপারেটর ইন্টারপ্রাইজ নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং সিস্টেম ইন্টেগ্রশনকারী প্রতিষ্ঠান এডিএন টেলিকম লিমিটেড।

এ ছাড়াও রয়েছে তৈরি পোশাক নির্মাতা ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান নরবান ফ্যাশন লিমিটেড, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও সিস্টেম ইন্টেগ্রেশনকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোরটিয়াম লিমিটেড, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ই-কমার্স, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ই-জেনারেশন লিমিটেড এবং লাইসেন্সধারী এনটিটিএন, আইটিসি ও আইআইজি অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড।

এদের মধ্যে প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ডিজিকন টেকনোলজিস এবং সফটওয়্যার পার্কটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা টেকসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজনই।

হাইটেক পার্ক কর্তৃৃপক্ষের ভাষ্য

এসব বিষয়ে জানতে মোবাইলে প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হোসনে আরা বেগমের সঙ্গে। ডাটা সেন্টারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওইটা (ডাটা সেন্টার) সম্পর্কে এখনো কোনো ডিসিশন (সিদ্ধান্ত) হয়নি। একটি অ্যাপ্লিকেশন আসছে ডাটা সেন্টার করার জন্য। কিন্তু আমরা এখনো কোনো অনুমতি দেইনি। একটি কমিটি তৈরি হয়েছে। কমিটি দেখভাল করবে ডাটা সেন্টার করা যায় কি না। তারপর সিদ্ধান্ত।’

‘ডাটা সেন্টার করা যায় না, এমন তো কোনো ব্যাপার নাই। ডাটা সেন্টার সব জায়গাতেই করা যায়। কিন্তু আমাদের ওই হাইটেক পার্কে ডাটা সেন্টার করা যায় কি না, এ জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন সাবমিট করে নাই।’

সফটওয়্যার পার্কটিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিস ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এমডি বলেন, ‘ওরা তো ওদের নিজস্ব অফিস ভাড়া নিয়েছে। তারা সফটওয়্যার কোম্পানি হিসেবে অফিস ভাড়া নেয়। কিছু অংশ ভাড়া নিয়েছে। আড়াই হাজার (বর্গফুট) মনে হয়।’

এদিকে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ডাটা সেন্টার স্থাপনে অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা করছেন প্রকল্পটির সংশ্লিষ্টরা।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা প্রিয়.কমকে জানান, মূল পরিকল্পনায় নেই ডাটা সেন্টার স্থাপনের বিষয়টি। এই হাইটেক পার্কটিতে শুধু সফটওয়্যারসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো স্থান পাওয়ার কথা। সেখানে নিয়ম না মেনে হাইটেক পার্কটিতে করা ডাটা সেন্টার স্থাপনের চিন্তা করা হচ্ছে। এতে হাইটেক পার্কটির অবকাঠামোগত সমস্যার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ