প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশিষ্টজনের অভিমত
আশা জেগে থাক

সমকাল : সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ না খুললেও সংলাপকে বিবদমান দুই পক্ষের চরম বৈরিতা দূর করার ‘প্রথম ধাপ’ বলছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তারা বলছেন, সংলাপের সফলতা নির্ভর করছে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দেবে তার ওপর। ক্ষমতাসীন পক্ষ যদি নিজেদের সিদ্ধান্তের বাইরে না যাওয়ার অবস্থানে অনড় থাকে তবে সংলাপে সফলতা আসবে না। সংলাপ সফল করতে বিরোধী পক্ষকেও তাদের সাত দফায় কাটছাঁট করতে হবে। সংলাপ সফল হবে- দেশের মানুষ চায় সেই আশাটাই জেগে থাক।

আলোচনা অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলেছেন, সংলাপ ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে দেশের সামনে। অতীতে যখনই সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে, তখনই দেশ সংকটে পড়েছে। বিপদ এড়ানোর একমাত্র পথ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, যা একমাত্র সংলাপের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব।

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের আহ্বান জানিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। তাতে সাড়া দেয়নি বিএনপি। তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর থেকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপি।

এবার আগ্রহী ছিল না আওয়ামী লীগ।

বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ের গঠিত নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপের আহ্বান জানিয়ে গত রোববার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়ে অপ্রত্যাশিত সাড়া পায়। ভোটের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি করে বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ।

গত বৃহস্পতিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনায় বরফ গলেনি, ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন অসন্তোষের কথা। সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির জবাবে আওয়ামী লীগ সাফ জানিয়েছে তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে আদালতের বিষয় বলে সংলাপের টেবিলে তুলতে নারাজ ক্ষমতাসীন দল।

এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের মাঝেও সংলাপে ইতিবাচক নানা দিক দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর বিএনপিকে আর বিশ্বাস করার সুযোগ ছিল না আওয়ামী লীগের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদারতা দেখিয়ে তাদের সংলাপে ডেকেছেন; এতে অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছে।

সংলাপে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিরোধীদের সভা-সমাবেশে আর বাধা থাকবে না। কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে সরকার দেখবে। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে বিদেশি পর্যবেক্ষক আসায় বাধা নেই। অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এ প্রতিশ্রুতিগুলোও অনেক বড় অর্জন। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এ অর্জনগুলো কাজে লাগবে। তিনি বলেন, প্র্রধানমন্ত্রী আলোচনার দ্বার খোলা রেখেছেন। বিএনপিকে এবার সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। হয়ত এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তারা আরও কিছু দাবি আদায় করে নিতে পারবে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।

তবে সভা-সমাবেশের বাধা দূর ও ‘গায়েবি মামলা’র প্রতিকারের প্রতিশ্রুতিকে বড় অর্জন মনে করছেন না সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সভা-সমাবেশের অধিকার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। গায়েবি মামলা কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হয় না। বিদেশি পর্যবেক্ষক আসার সময় পেরিয়ে গেছে। নির্বাচনের দুই মাসও বাকি নেই। এখন আর পর্যবেক্ষক আসার সময় নেই। অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে।

সংবিধানের বাইরে যাওয়া হবে না- আওয়ামী লীগের এ অবস্থানকে সমস্যা সমাধানের অন্তরায় মনে করছেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭ নম্বর অনুষ্ঠানে জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মর্জিমাফিক আইন করে তাকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশের এখন মূল সমস্যা হলো আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি-না। সংলাপে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়নি।

তবে তিনি বলেন, তার পরও সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। তবে এমন বারোয়ারি আলোচনা আর নয়। ইস্যুভিত্তিক দরকষাকষি হতে হবে ছোট পরিসরে। দু’পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। বিএনপিকে তার সাত দফার মধ্যে যে দাবি নির্বাচন সংশ্নিষ্ট সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বাকিগুলোতে ছাড় দিতে হবে। সরকারকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক ইস্যুগুলোতে ছাড় দিতে হবে। ভোটের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে কীভাবে নিরপেক্ষ রাখা যায় তার পথ খুঁজতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষপাতমূলক আচরণে লাগাম টানার উপায় বের করতে হবে। নইলে আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন হবে, যার পরিণতি হবে দেশের জন্য ভয়াবহ।

গতকাল বিকল্পধারার সঙ্গে সংলাপে বসে ১৪ দল। আগামীকাল বসবে জাতীয় পার্টির সঙ্গে। তার পর বসবে বাম দলগুলোর সঙ্গে। তবে এসব সংলাপকে গুরুত্ব দিতে নারাজ কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, যা করার আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে করতে হবে। তারা বড় শক্তি, তাই তাদের ছাড় দিতে হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে ১৯৯৫ সালে কমনওয়েলথের মহাসচিবের দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফানের মধ্যস্থতায় সংলাপে বসেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। ২০০৬ সালে সংলাপ হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। ২০১৩ সালে সংলাপ হয় জাতিসংঘের মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায়। তবে কোনো সংলাপই সফল হয়নি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ভারতবর্ষে সংলাপে সফলতার নজির নেই। সেই ১৯৪৬ সালে নেহেরু-জিন্নাহ এবং ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়ার সংলাপ সফল হয়নি। ১৪ দল ও ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যে ধারায় চলছে তার সাফল্য নিয়েও সন্দিহান তিনি। তার পরও তার তাগিদ আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়া আর পথ নেই। তিনি বলেন, সংলাপে ব্যর্থতার ফল কত ভয়ঙ্কর তা ইতিহাস দেখলেই স্পষ্ট। ১৯৯৫ সালে সংলাপের ব্যর্থতার কারণে ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে। ২০০৬ সালের ব্যর্থ সংলাপ এক-এগারো ডেকে আনে। ২০১৩ সালের ব্যর্থতায় ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন হয়েছে। এবারের সংলাপ ব্যর্থ হলেও ভয়াবহ কিছু একটা হতে পারে।

সৈয়দ মকসুদ বলেন, দু’পক্ষের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। জনগণ তাদের ওপর আশা করছে, সমাধানের পথ পাওয়া যাবে। সংলাপ ব্যর্থ হলে তারা জনগণের আস্থা হারাবেন। বিরোধী পক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। তাদের ভয় কারচুপির নির্বাচন হবে। সরকারকে ছাড় দিয়ে বিরোধীদের শঙ্কা দূর করতে হবে।

আওয়ামী লীগ বলছে ঐক্যফ্রন্ট চাইলে আবারও আলোচনা হবে; এ ঘোষণাকে ইতিবাচক বলছেন আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, বিএনপি প্রথম দিনের আলোচনায় অসন্তোষের কথা জানালেও তাদের উচিত আলোচনার সুযোগ নেওয়া। তাদের বুঝতে হবে সব দাবি পূরণ হয় না। আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

বৃহস্পতিবারের সৌহার্দ্যপূর্ণ সংলাপকে ইতিবাচক বললেও আলোচনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় হতাশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বিচার মানি, তালগাছ আমার’- এ অবস্থানে রয়ে গেছে সরকার পক্ষ। ক্ষমতাসীন হিসেবে তাদের দায়িত্ব বেশি। তাদের বেশি ছাড় দেওয়া উচিত।

প্রথম দিনের আলোচনায় খুব বেশি অর্জন না দেখলেও সংলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সংলাপের ব্যর্থতা মানে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে। এর ফল কী হবে, তা আগেই সবাই অনুমান করতে পারছে। একতরফা নির্বাচন দেশের জন্য ক্ষতিকর। এটা এড়াতে সংলাপ ছাড়া পথ নেই। সংলাপ চালিয়ে যেতেই হবে।