Skip to main content

শুকরানা মাহফিলকে কেন্দ্র করে বিভক্ত কওমি আলেমরা

আমিন মুনশি : দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিল পাস হওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংসর্ধনা দেয়ার বিষয়টি। শুরুতে সংবর্ধনা দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘শুকরানা মাহফিল’ করবেন তারা। তবে এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি হেফাজতের বেশ কিছু নেতাকর্মী। প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের অনেকেই এর কড়া সমালোচনা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তাদের বিভক্তির আলামত। হেফাজতের ভেতর এ নিয়ে অসন্তোষ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। অস্থিরতা বিরাজ করছে মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বহু নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় প্রধানমন্ত্রীকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আগামী ৪ নভেম্বর (রোববার) ‘আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া’ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফির নেতৃত্বে এ সংবর্ধনা দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে হেফাজতনেতা মুফতি মাহফুজুল হক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এ আয়োজন করা হচ্ছে। শুকরিয়া আদায় করতে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।’ এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দিতে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। সারাদেশ থেকে ব্যাপক জনসমাগমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। হেফাজতে ইসলাম নিজেকে অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও বর্তমান বাস্তবতায় তাদের গুরুত্ব রয়েছে রাজনৈতিক সকল পক্ষের কাছেই। আলেমদের মধ্যে যারা বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের সমর্থক তারা প্রধামন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার বিপক্ষে। সংবর্ধনার আয়োজন ছোট হোক বা বড়, গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে কোনোভাবেই তাদের সম্মতি নেই এতে। আর যারা আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলীয় জোটের সমর্থক তারা যে কোনো মূল্যে সংবর্ধনা দিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের কাছাকাছি যাওয়া, সামনের নির্বাচন বা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা; অনেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য শেখ হাসিনার কাছে তদবিরও শুরু করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘কওমি সনদের স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। তবে আমরা ১৩ দফা দাবি থেকে এখনও সরে আসিনি। ঈমানী আন্দোলন কোন সুযোগ-সুবিধার কাছে মাথা নত করবেনা।’ ফেসবুকে আমিন ইকবাল নামে একজন কওমি আলেম তার পোস্টে লিখেছেন-  ‘আলেমদের মধ্যে যারা বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কোনো দলের সঙ্গেই সম্পৃক্ত নন। বড় এই দুই দলের কোনো পক্ষকে বিশেষ সমর্থনও করেন না। কেবল ইসলামের স্বার্থেই সংবর্ধনা দেওয়া-না-দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন বা নেওয়ার কথা ভাবছেন। তারা একই সঙ্গে নানা বিষয়ে দুশ্চিন্তা করছেন। তারা ২০১৩ সালের ৫ মে’র রাতের কথা ভুলতে পারছেন না। তাদের কথা হলো, সরকার আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে ভালো কথা। কিন্তু এই সরকারই তো শাপলাচত্ত্বরে হেফাজতকর্মীদের বুকে গুলি চালিয়েছে। তাজা রক্ত ঝরিয়েছে। নিষ্পাপ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তাহলে, এই সরকারকে আমরা সংবর্ধনা দেব কোন হাতে! তারা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শেখ হাসিনাকে সম্মাননা দেওয়া মানে ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা। শেখ হাসিনার ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করার পথ সুগম করা।’ তাই এ সংবর্ধনা হেফাজতের আত্মদানের সঙ্গে বেইমানি। তবে কওমি মাদরাসার একটি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ মনে করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেয়া প্রয়োজন। কারণ, তিনি ইসলামের জন্য অনেকগুলি অসাধারণ কাজ করেছেন। আর তাই আমাদের পক্ষ থেকেও তাঁর সংবর্ধনা হবে অসাধারণ।’ বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মুফতি হাবিবুর রহমান মিছবাহ মনে করেন, হেফাজতের পক্ষ থেকে এই ধরনের আয়োজন নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি। আল্লামা শফির আশেপাশের কিছু লোক ওনার অসুস্থতাকে ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে। তারা এই সংবর্ধনার বৈধতায় কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ হেফাজতের এ উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখছে না। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছেন সেজন্য অন্য পদ্ধতিতেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যেতো। ভবিষ্যতে এ জন্য আলেমদের আফসোস করতে হতে পারে।’