প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘নির্মাতার মায়ের মৃত্যু, থানায় প্রতারণার অভিযোগ দায়ের’

মহিব আল হাসান: গতকাল শাহবাগ থানায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে ফিরে আসেন চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক শিকদার। তিনি জানান, তার মামলা গ্রহণ করেনি শাহবাগ থানা পুলিশ। তবে থানা সূত্রে জানা যায় তারা তার মায়ের মৃত্যুতে চিকিৎসকদের প্রতারণার অভিযোগটি অভিযোগ আকারে গ্রহণ করেছে পুলিশ।

গত বুধবার (৩১ অক্টোবর) রাত দশটায় পরিচালক রফিক শিকদারের মা রওশন আরা মারা যান। কিন্তু মারা যাওয়ার দুই অতিবাহিত হলেও এখনও লাশ দাফন করেননি তিনি। মায়ের মৃত্যুর বিচারের জন্য মায়ের লাশ এখন পর্যন্ত হিমঘরে রেখেছেন তিনি।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে রফিক শিকদার আমাদের সময় ডট কমকে বলেন, ‘ আমার মায়ের দুটো কিডনিই চিকিৎসকরা নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। এমনকি আমার মা আরও তিনদিন আগে মারা গেছে ,তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রেখেছিলেন চিকিৎসকরা। দ্বিতীয়বার আমার সাথে প্রতারণা করেছেন তারা।

রফিক শিকদার আরও জানান, ‘ মায়ের মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে মায়ের লাশ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। তখন তাদের বলি আগে ময়নাতদন্ত হবে তারপর মায়ের লাশ নিয়ে যাব। তখন গতকাল আমি শাহবাগ থানায় মামলা করতে গেলে তারা মামলা গ্রহণ করেনি। সাধারণ ডায়েরি হিসেবে অভিযোগ গ্রহণ করেছেন। মায়ের ডেথ সার্টিফিকেট ও ময়নাতদন্ত করার জন্য আমি আজ ঢাকা মেডিকেলে এসেছি। কিন্তু তারা বলছেন আজ নয়, আগামীকাল ময়নাতদন্ত করা হবে।’

বিষয়টি নিয়ে রফিক শিকদার সাংবাদিকদের সাথে গত ১৯ সেপ্টেম্বর কথা বলেন। নির্মাতা রফিক শিকদার বলেন,‘আমার মা রওশন আরা (৫৫)। আমার মায়ের বাম কিডনি ও মুত্রথলিতে সমস্যা ছিল। ডান কিডনিটা পুরোপুরি ভালো ছিল। তার ডায়বেটিস ও হাই প্রেসার ছিল না। ডাক্তারের পরামর্শে আমি আমার মায়ের বাম কিডনি সার্জারি করলে আমার মা পুরোপুরি সুস্থ হন এবং সাভাবিকভাবে চলাফেরা শুরু করেন।

ঈদে পাবনা থাকা অবস্থায় আমাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর হাসপাতালে (পিজি) থেকে জানানো হয় আমার মায়ের কিডনিটা ফেলে দিতে হবে। তাহলে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন। আর সেটা না করলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা হতে পারে। এরপর ঢাকায় আসলে মার অপারেশন ৫ সেপ্টেম্বর হয় । এরপর মা সুস্থ থাকলেও কয়েকদিন পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অস্ত্রোপচারের কথা বলে দুটি কিডনিই অপসারণ করার কথা বলছেন রফিক শিকদার। এদিকে শুরু থেকেই বিষয়টি অস্বীকার করছেন চিকিৎসকরা।
কিডনি জটিলতার কারণে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক শিকদারের মা রওশন আরার অস্ত্রোপচার করেন কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের প্রধান হাবিবুর রহমান দুলাল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর রোগীর দেহে জটিলতা সৃষ্টি হলে রফিক শিকদার নিশ্চিত হন, তাঁর মায়ের দুটো কিডনি ফেলে দেওয়া হয়েছে।

গত দুই মাস ধরেই রফিক শিকদার অভিযোগ করে আসছিলেন, তাঁর মায়ের কিডনি সরিয়ে ফেলেছেন চিকিৎসকরা। গত সোমবার লিখিত এক বক্তব্যের মাধ্যমেও এর বিচার দাবি করেন তিনি। রফিক শিকদার সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি করেন, ডাক্তার হাবিবুর রহমান দুলাল ও তাঁর সহযোগীদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয়।

সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলনে রফিক শিকদার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে প্রশ্ন, কে বড়? আমার অসহায় মা নাকি অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলাল? আপনি কার? শোষকের নাকি শোষিতের? নিশ্চয়ই আপনি শোষিতের পক্ষে। ডাক্তার সাহেব কত টাকার বিনিময়ে আমার বোকাসোকা মায়ের কিডনিটি অন্যত্র বিক্রি করেছেন, তা জানার চেষ্টা করবেন কি? আমার মায়ের সঙ্গে করা এই অন্যায়ের বিচার শেষ পর্যন্ত পাব কি? সুবিচার ও আপনার প্রতীক্ষায় রইলাম। অন্যথায় জিতে যাবে ডাক্তার। ডাক্তার জিতলে হেরে যাবে মানবতা।’

এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিউজ হলে অভিযুক্ত চিকিৎসক হাবিবুর রহমান দুলাল দাবি করেন, রফিক শিকদারের মায়ের কিডনিটি প্রকৃতিগতভাবেই জোড়া লাগানো ছিল। যে কারণে নষ্ট কিডনিটি ফেলতে গিয়ে অপারেশনকৃত স্থানে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়, যা পরে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে রোগীর ডান দিকের সুস্থ কিডনিটিও ফেলে দিতে হয়েছে। অথচ অপারেশনের পূর্বের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট, আলট্রাসনোগ্রামের একাধিক রিপোর্ট বলছে, আমার মায়ের দুটো কিডনিই আলাদা আলাদা স্থানে আবদ্ধ ছিল।’

তবে এর আগে একাধিক মিডিয়াকে ডাক্তার হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘অভিযোগ তো মিথ্যা নয়, আমরা বললাম এটা আমরা বাঁ দিকে অপারেশন করেছি, বাঁ কিডনি ফেলার জন্য এটা সিদ্ধান্ত ছিল। জন্মগতভাবে বাঁ কিডনির সমস্যা ছিল, এর সঙ্গে ডান দিকের কিডনি এমনভাবে পেঁচানো ছিল যে এবং ওই অবস্থা বিøডিং হচ্ছিল, যা কোনোভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে অপারেশনের সময় ডান কিডনিটাও উঠে চলে আসে।’

এদিকে, আইনি পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমে ২৯ সেপ্টেম্বর রফিক শিকদার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাধ্যমে অভিযুক্ত চিকিৎসক হাবিবুর রহমানকে একটি আইনি নোটিশ পাঠান। এ বিষয়ে রফিক শিকদার বলেন, ‘আইনি নোটিশ পাঠানোর পর অভিযুক্ত চিকিৎসক দুলাল দোষ স্বীকার করে কিডনি প্রতিস্থাপনের সব খরচ বহনসহ কিডনিদাতাকে আট লাখ টাকা দিতে সম্মত হন। এ নিয়ে স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়। কিন্তু এখন গড়িমসি করছেন।’

রফিক শিকদার বলেন, ‘আমার মায়ের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। এই তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য হচ্ছে অভিযুক্ত প্রফেসর হাবিবুর রহমান দুলাল। যিনি অভিযুক্ত, তিনি তদন্ত কমিটিতে কী করেন?’

এ বিষয়ে ডাক্তার হাবিবুর রহমান দুলালের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এ ঘটনার পর হাসপাতালের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি ও ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ