প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আলোচনা : শুরু হোক সুস্থ প্রতিযোগিতার ধারা

বিভুরঞ্জন সরকার : এই লেখাটি যখন পাঠক পড়বেন তখন তাদের জানা হয়ে যাবে বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ বনাম আলোচনার ফলাফল। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হচ্ছে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে। এক জটিল, বৈরি ও তিক্ত পরিবেশে এই আলোচনার টেবিলে বসছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি ও আরো কিছু দল ও ব্যক্তির সমন্বয়ে নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মোট পাঁচ নেতা জীবনে প্রথমবারের মতো গণভবনে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সরকার পক্ষ বলছেন, তারা আলোচনায় বসবেন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে, বিএনপির সঙ্গে নয়। তাত্ত্বিকভাবে হয়তো এটা ঠিক কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিএনপি আলোচনার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক সংকট কাটবে না। পরোক্ষভাবে হলেও প্রথম দিনের আলোচনাতেই বিএনপির শীর্ষ পাঁচ নেতা থাকছেন। এতোদিনের জট একদিনের দু’তিন ঘণ্টার আলোচনায় খুলবে বলে কেউ মনে করেন না। তবে উদার ও সমাধানের মনোভাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসলে উত্তেজনার পারদ যে নেমে আসবে, সেটাও আমাদের দেশের রাজনীতির জন্য কম পাওয়া নয়। উভয় পক্ষের যদি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকে তাহলে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পথে হাঁটতে পারবো।

একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্যটির আদর্শ, কর্মসূচি, দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য সব দেশেই আছে এবং থাকে। সবাই সব বিষয়ে একমত হলে তো একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বই থাকতো না। গণতান্ত্রিক সমাজে বহুমত স্বাভাবিক ঘটনা। দ্বন্দ্ব-সংঘাত নয়, দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হয়। রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাও স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব গণতন্ত্রের জন্য, সুস্থ রাজনীতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়। আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গিতে যেমন মৌলিক পার্থক্য আছে, তেমনি এক দল আরেক দলের অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মানসিক জড়তা আছে। এক দলের প্রতি আরেক দলের আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট প্রবল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই অবস্থান বা মানসিকতার কথা কারো অজানা নয়। সচেতন সবাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু সমাধান কীভাবে সেটা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন কি?

হাসিনা-খালেদার বৈঠকের বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি চাই। ওনারা ( খালেদা জিয়া) খুনিদের রক্ষা করতে চান। এই দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে বৈঠকে বসে কোনো লাভ নেই’। পঁচাত্তরের হত্যাকান্ড নিয়ে বিএনপির দৃষ্টভঙ্গি বদলায়নি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা ঠিক হয়নি এটা বিএনপি কখনো বলেনি। তারপর আবার ঘটেছে একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। হত্যার রাজনীতির বিরুদ্ধে বিএনপি যেমন সোচ্চার হয়নি, তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও তাদের অবস্থান ত্রুটিপূর্ণ।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে চলছে খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতা। আওয়ামী লীগের খারাপ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিএনপি। বিএনপির খারাপটা ধরে আওয়ামী লীগ। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের জনমনস্তত্ত্বে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করা যায়। সেটা হলো, আওয়ামী লীগ একটি খারাপ কাজ করলে তা নিয়ে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় ওঠে, বিএনপির ক্ষেত্রে সাধারণত তেমন হয় না। শেখ হাসিনার মুখ থেকে সবাই সব সময় সুবচন আশা করেন, খালেদা জিয়ার কাছে নয়।

আওয়ামী লীগের ত্রুটি-স্খলন দেখার জন্য চারদিকে সব ওয়াচডগ চোখ-কান খাড়া করে থাকবে আর তার প্রতিপক্ষ সব কিছুতেই মার্জনা পেয়ে যাবে এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনীতিতে সুস্থতা ফিরে আসার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। সে জন্যই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজমান সংকট দূর করতে হলে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মনোভাব যেমন করতে হবে, তেমনি রাজনীতি সচেতন মহলের মনোভাবেও পরিবর্তন আনতে হবে। খারাপকে খারাপ বলার সৎ সাহস সবারই থাকতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার যে শুভ সূচনা হলো তা অব্যাহত থাক। দলপ্রীতি থেকে আমাদের সবার মধ্যে দেশপ্রীতি প্রবল হয়ে উঠুক। ভালোর সঙ্গে ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতার রীতি রাজনীতিতে ফিরে আসুক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ