Skip to main content

‘রাজনীতি করলে ‘চাড়াল’-‘মুচি’র সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হয়?’

অসীম সাহা : রাজনীতি করলে ‘চাড়াল’-‘মুচির’ সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হয়। কথাটি বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি মহানায়ক কাদের সিদ্দিকী। রাজধানীর মতিঝিলে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ-কথা বলেন। তিনি হয়তো প্রতীকী অর্থে কথাটা বলেছেন। তিনি সম্ভবত বলতে চেয়েছেন, শুধু বড় দলগুলোর সঙ্গে নয়, শেখ হাসিনার উচিত ‘চাড়াল’ ও ‘মুচি’দের মতো ছোট দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনায় বসা। তিনি কথাটি খুব ভেবে-চিন্তে বলেছেন বলে আমি মনে করি না। তা না হলে ছোট দলগুলোকে তিনি তথাকথিত ছোট জাত বা গোত্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করবেন কেন? তিনি পড়াশোনা জানা মানুষ। তার লেখা কলামগুলো আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে নিয়মিত পড়ি। তিনি মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে ছাড় দেয়ার লোক নন। সেই অসম সাহসী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ কাদের সিদ্দিকীর মুখ ফসকে যে দুটো শব্দ বেরিয়ে এলো, তা যে এই দুটো গোত্রের মানুষের জন্য কতো অবমাননাকর, তা নিশ্চয়ই তিনি বোঝেন। এমনিতেই ব্রাহ্মণ্যবাদের চিরকালীন জাঁতাকলে পিষ্ট তথাকথিত নিম্নবর্গে স্থান পাওয়া এই মানুষগুলো এখনো দলিত, মথিত ও পর্যুদস্ত হয়ে আছেন। ভারতে আজো জাত-পাতের ঘৃণিত অভিশাপে সর্বক্ষেত্রে তাদের জীবন দুর্বিষহ। ভারতের বিহার অঞ্চলে এখনো বাহ্মণ্যবাদীদের আগুনে পুড়ে মরতে হচ্ছে গান্ধীজী কর্তৃক প্রদত্ত আহ্লাদী নামের ‘হরিজন’দেরকে। এখনো দলিতশ্রেণির নামে এই ‘চাড়াল’ ও ‘মুচিরা’ নিম্নশ্রেণি হিসেবে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে ঘৃণার পাত্র। আপনি এ কথার মাধ্যম তাদেরকে কি সেই ঘৃণার পাত্র হিসেবেই ফের ছোট করে দেখলেন না? কেন ‘চাড়াল’-মুচিরা’ আজো ছোট? কে তাদের ছোট করে রেখেছে? এ ইতিহাস আপনার ভালোই জানা আছে। তবু আপনি প্রতীকী অর্থে হলেও এদের যেভাবে ছোট করে দেখেছেন, তা কি আপনাকে মানায়? তা ছাড়া আপনি এ-ও জানেন, যাদের আমরা নিচু বলে পায়ের নিচে ঠেলে রাখতে চাইছি, এখন তারা আর সেই ছোট স্থানে নেই। ভারতের সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর কিন্তু আপনার উক্তিমতো ‘নমশূদ্র’ বা ‘চাড়াল’ই ছিলেন। সেই ‘চাড়াল’কে আপনি তা হলে কোন স্থানে রাখবেন? আপনি বলেছেন, “যাদের কাছ থেকে আজো পোড়া গন্ধ আসছে, তাদের সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হয়।” এটা কি সত্যি সত্যি আপনার মনের কথা? যদি হয়ে থাকে, তা হলে আপনি স্পষ্ট করে বলুন, কাদের কাছ থেকে আাজো পোড়া গন্ধ আসছে? আপনি এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, “সংলাপের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বলেই নিতে পেরেছেন।” যদি তাই হয়, তা হলে আপনার কেন এটা মনে হলো না, তিনি যখন ‘পোড়া গন্ধের’ লোকদের সঙ্গে সংলাপে বসতে পেরেছেন, তখন আপনার কথিত ‘চাড়াল-মুচি’দের সঙ্গেও বসতে দ্বিধা করবেন না। অর্থাৎ আপনাদের মতো ‘চাড়াল-‘মুচি’ বা ছোট ছোট দলের সঙ্গেও নিশ্চয়ই তিনি সংলাপে বসবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু এই সঙ্গে আমি এ-ও বলবো, আপনার দল ছোট হতে পারে, কিন্তু আপনি নিজেকে কেন ছোট ভাবছেন? আপনি তো ব্রাহ্মণদের চেয়েও অনেক বড় বাহ্মণ। কারণ আপনি কাদের সিদ্দিকী। আপনি বাঘা সিদ্দিকী, আপনি বঙ্গবীর ও বীরপ্রতীক। আপনার সঙ্গে কোনো ব্রাহ্মণের তুলনা হয়? আপনার দলের নাম ‘কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ’। এই সমাজে, এই রাষ্ট্রে তারাও তো ‘চাড়াল’ ও ‘মুচি’র পর্যায়েই আছে। তাদেরকে কি আপনি এভাবে সম্বোধন করতে পারবেন না পারা উচিত? আপনি এদেশের গৌরবোজ্জ্বাল ইতিহাসের এক মহিমান্বিত মহানায়ক। আপনার মুখে প্রতীকী অর্থে বা ভুল করে হলেও একথা মানায় না! আমি বিশ্বাস করি, এটা আপনার মনের কথা নয়। এটা শুধুই কথার কথা। কিন্তু কথার কথাও যে কখনো কখনো কাবাঘরে আঘাতের শামিল হয় উঠতে পারে, আপনি নিশ্চয়ই তা বোঝেন। আমরা আপনাকে ভুল অবস্থানে দেখতে চাই না। দেখতে চাই সেই অবস্থানেই, যে অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের এক মহানায়কের। কারণ, আপনি কাদের সিদ্দিকী-আপনি শুধুই কাদের সিদ্দিকী। লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

অন্যান্য সংবাদ