প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুঃস্বপ্নটাকে আমরা যাতে দুঃসময় না হতে দেই

সেলিম জাহান : বিষয়টি কালি লেপনের, ব্যক্তির মুখে তো অবশ্যই, সেই সঙ্গে দেশের ও জাতিরও। সাম্প্রতিক সময়ে দু’টো ঘটনায় ঐ চুনকালির ব্যাপারটি আবার মনের দরজায় কড়া নাড়ল অনেকটা ঐ ‘অবনী বাড়ী আছো’? গোছের। প্রথম বিষয়টি ইতিবাচক , কোন এক সময়ে লেপন করা কলঙ্কের মোচন। দ্বিতীয় বিষয়টি কিন্তু নেতিবাচক, নতুন করে চুনকালি লেপন। গত ২৯ অক্টোবর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। খবরটা শোনা মাত্র দু’টো অনুভূতি হদয়ের আনাচে কানাচে ছলাৎ ছলাৎ করে বইতে লাগল ‘আহ্, অবশেষে..’ এবং ‘জয় বাংলা’।

১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা খুব পরিষ্কার-স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী। সুতরাং যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াতের শাস্তির বদলে আশির দশকে এহেন একটি অপশক্তিকে বাংলাদেশের মাটিতে মর্যাদার সাথে পুনর্বাসিত করলেন তৎকালীন শাসকেরা। জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতারা মন্ত্রী হলেন, যে বাংলাদেশের বিরোধিতা তারা করেছিলেন, সে দেশটির পতাকা শোভিত সরকারী গাড়ীতে ক্ষমতার দম্ভে তারা সদর্পে বিচরণ করতে লাগলেন এই বাংলাদেশের মাটিতেই। ন্যক্কারজনক অসম্মান ও তাচ্ছিল্য দেখানো হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি, এ দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে সে কলঙ্ক মোচনের যে প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল, আজ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে সেই কালি আরো অনেকখানি অপসারণ করতে পারলাম আমরা জাতি হিসেবে।

কিন্তু কালিমা মোচনের এ সুখসংবাদ চন্দ্রগ্রহণের রাহুর মতো ঢাকা পড়ে যায়, যখন দেখি যে ধর্মঘটের নামে কালি লেপন করা হচ্ছে নিরীহ মানুষের মুখে, গাড়ীতে, বাসে এবং অন্যান্য যানবাহনে। কিন্তু সে কালিমা তো একজন মানুষের মুখে সীমাবদ্ধ থাকছে না, ছড়িয়ে পড়ছে দেশের কপালে, জাতির কপোলে। লুণ্ঠিত হচ্ছে ব্যক্তি মানুষের সম্মান, দেশের ভাবমূর্তি, জাতির অহংকার।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় অপশক্তির কাছে শুধু যে পরাভব মানছে মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা আর স্বাচ্ছন্দ্য তাই নয়, মানুষের জীবন জিম্মি হয়ে পড়েছে তার কাছে। তাই তো দেখি অসুস্থ রোগী রাস্তায় পড়ে আছে। তাদের হাসপাতালে নেয়া যাচ্ছে না। সেবার অভাবে জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে কচি শিশুর। কিন্তু তবু নারকীয় শক্তির মানবতা জেগে উঠছে না এই তা-বের, এই অরাজকতার, এই নাশকতার শেষ কোথায়? আমরা সবাই কি শিকার হতেই থাকব এই সব পাশবিক প্রক্রিয়ার? আমরা কি মধ্যযুগীয় বর্বরতার পূজারী হয়ে গেছি? পেশীশক্তিই কি আমাদের একমাত্র জীবন উপকরণ হয়ে গেল?

নিমর্মতার জীবনবোধই কি আমাদের দর্শন, সন্ত্রাসই কি আমাদের একমাত্র ভাষা?
‘তবু পাশবিকতা নাহি মানে পরাভব ‘- এটাই কি আমাদের মেনে নিতে হবে?

আমাদের মুখে, দেশের কপালে, জাতির কপোলে কালিমা আমরাই লেপন করতে পারি আমাদের দুষ্কর্ম দ্বারা, আবার সেই কালিমা আমরাই মোচন করতে পারি আমাদের সুকর্মের দ্বারা। সিদ্ধান্তটা আমাদেরই , দুঃস্বপ্নটাকে আমরা যাতে দুঃসময় না হতে দেই।

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ, তারাই বেশি দেখে কোন কিছু ছাড়া;
যাদের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র প্রেম-ভালেবাসা নেই,
পৃথিবীকে নিমিষে অচল করে দিতে পারে তারা।’
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়,
মহৎ সত্য বা রীতি কিংবা মানবতা অথবা প্রীতি
জেগে যেন ওঠে তারা, হয় যেন শুধু তাদেরই জয়’।
(ঈষৎ পরিবর্তিত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত