প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শীতল হাওয়া, নাকি উত্তেজনা ছড়ানোর পূর্বাভাস?

বিভুরঞ্জন সরকার: প্রকৃতিতে শীতের আমেজ অনুভূত হচ্ছে। গরমের তীব্রতা কমেছে। শেষ রাতে ঢাকা শহরেও শীত শীত লাগতে শুরু করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কার মুখে একমুঠো বরফজল ছিটিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১ নভেম্বর গণভবনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১৬ নেতার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন তিনি।

২৮ অক্টোবর সকালেও কারো মনে হয়নি যে, সরকার পক্ষ বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন ২৮ অক্টোবর রাতে। পরদিনই বরফ গলে পানি। সবাকেই অবাক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২৯ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত এজেন্ডায় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আগ্রহ বা সম্মতির কথা জানান। ব্যস, দ্রুত বদলে যেতে থাকে রাজনীতির দৃশ্যপট। উত্তেজনা প্রশমিত হয়। তৈরি হয় আশাবাদ। শঙ্কাও দেখা দেয় কারো কারো মনে। প্রশ্নও উঠতে থাকে নানা ধরনের। হঠাৎ সরকার নমনীয় হলো কেনো? এটা কি সরকারের পরাজয়? এতে কি বিএনপির কোন লাভ হলো?

আলোচনায় বসতে সরকার রাজি হওয়ায় বিএনপি মহলে কিছুটা উচ্ছ্বাসের ভাব এলেও তা স্থায়ী হয়নি। কারণ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপরর্সন খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর পরদিন আবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আগে বিচারিক আদালতের দেয়া পাঁচ বছরের দণ্ডাদেশ বাড়িয়ে দশ বছর করেছেন হাইকোর্ট। দলীয় প্রধানের এসব দণ্ড বিএনপির জন্য সুখবর নয় বরং তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। দুঃখবোধ।

সরকার তাদের চাপে নতি স্বীকার করে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে বলে বিএনপি নেতাদের যেখানে বাগাড়ম্বর করার কথা, সেখানে তাদের নেত্রীর মামলা ও সাজা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আলোচনার সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে হচ্ছে। এতোদিন কারো সঙ্গে সংলাপ হবে না বলে প্রচার করে সরকার পক্ষ একটি অবস্থা তৈরি করেছে। হঠাৎ সুর বদলে বাজনদারদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে পেরে ওঠার সক্ষমতা যে অন্যরা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটা আরেক দফা প্রমাণ হয়েছে। এখন ফলাফল যাই হোক না কেনো, কেউ এটা বলতে পারবে না যে বিরোধীদের সঙ্গে সরকার আলোচনায় বসতে চায় না।

সরকার আলোচনায় বসছে এবং এটা জানিয়ে যে আলোচনা হবে ‘সংবিধানসম্মত’। ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেবেন ড. কামাল হোসেন, যিনি আবার শুধু সংবিধান-বিশেষজ্ঞই নন, সংবিধান প্রণয়ন কমিটিরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ করেছেন। প্রকাশ্য সভায়ও বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করছেন। বিএনপি নেতাদের তা হজম করতে হচ্ছে। তারা সেভাবে জিয়াবন্দনা করতে পারছেন না। এটা তো অনেকটা কিল খেয়ে কিল হজম করার অবস্থা।

বিএনপি বড় দল। জনসভায় তারাই মানুষ আনছে। কিন্তু নেতৃত্ব তাদের হাতে নেই। ‘সংবিধানসম্মত’ আলোচনায় বসে তাদের কী লাভ? শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন না। সংসদও বহাল থাকবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা নেই। কারণ তিনি রাজবন্দী নন, তিনি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে আছেন। আদালতের নির্দেশ ছাড়া তার মুক্তির সুযোগ কম। তাহলে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি কী পাচ্ছে?

সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলতে পারেন কামাল হোসেন। এক মিনিটে সংবিধান সংশোধনের কথা তিনি বলেছেন। ‘এক মিনিটে সংবিধান পরিবর্তন’ কখনোই কোনো ভালো নজির হতে পারে না। সংবিধানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল এক মিনিটে পরিবর্তন করার ভাবনা-চিন্তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাছাড়া কোনো বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য না থাকলে সংবিধানের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু সংশোধনের প্রস্তাব আনা সম্ভব নয়। এরশাদের পদত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে যারা বর্তমান সরকারকেও সেভাবে ‘এক্সিট রুট’ দেখাতে চান, তারা রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্দোলনের শক্তির অবস্থান না বুঝেই সেটা করেন। এরশাদের বিরুদ্ধে দেশে যে রকম জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিলো, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তেমন ঐক্য সম্ভব নয়। এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ এক ধারার রাজনৈতিক দল নয়। এরশাদকে যেভাবে ক্ষমতা থেকে বিদায় করা সম্ভব, শেখ হাসিনাকে সেভাবে সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারতে সক্ষম হয়েছে।

নির্বাচনের আগে আন্দোলন গড়ার মতো পর্যাপ্ত সময় বিরোধীদের হাতে নেই। আজ থেকে শুরু হচ্ছে ‘আলোচনা সপ্তাহ’। আন্দোলন কে করবে? কীভাবে করবে? শীতের সময় উত্তাপ ছড়ানোর উপলক্ষ হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু তা কাজে লাগানোর মতো যোগ্যতা বিএনপির আছে কিনা, তা নিয়ে সবারই সংশয় আছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস হলো আমাদের দেশে আন্দোলন ও রাজনীতির অনুকূল সময়। এই সময়েই দেশে ইতিহাস তৈরি করা সব রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে। এবার ডিসেম্বর কি কোনো কিছুর পূর্বাভাস দিচ্ছে? সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ