প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যে টার্মিনালের কাজ পেতে বিশ্বসেরাদের দৌড়ঝাঁপ

কালের কন্ঠ : আয়তনে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে দ্বিগুণ বড় এবং বঙ্গোপসাগর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠাসহ অনেক সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠছে আগামীর বন্দর ‘বে টার্মিনাল’। এই টার্মিনাল ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে একাই মোকাবেলা করতে সক্ষম। এরই মধ্যে দেশে ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বে টার্মিনাল ঘিরে এখন বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

এখন পর্যন্ত চীনের চায়না মার্চেন্টস স্পোর্ট হোল্ডিং কম্পানি লিমিটেড; সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড; সিঙ্গাপুরভিত্তিক কম্পানি পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল, ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস; ভারতের আদানি পোর্ট; দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই গ্রুপ এবং ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন বে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। বে টার্মিনালের কাজ পাওয়া নিয়ে বিশ্বের এসব শীর্ষ প্রভাবশালী দেশের মধ্যে রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের সেরা পোর্ট অপারেটররা বে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করতে চাওয়া সৌভাগ্যের। সব প্রস্তাবনা বিবেচনায় নিয়ে আমরা যাচাই করছি; কোন দেশকে কাজ দেওয়া হবে সে বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা চেয়েছি। সরকারের গাইডলাইন পেলেই অগ্রসর হব।’ তবে এর আগে আগামী জুনে ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করব। পরে অপারেটরকে দেওয়া হবে জেটি বেকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য যোগ করেন তিনি।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে সর্বোচ্চ ১৮ শ একক ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ ঢুকতে পারে; আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে পাঁচ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। এখন বন্দরে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ে; আর একেবারে সাগরে অবস্থানের কারণে বে টার্মিনালে দিনে-রাতে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে ও ছেড়ে যেতে পারবে। এতে পণ্য পরিবহন খরচ ও প্রচুর সময় সাশ্রয় হবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটি-টার্মিনালে একসঙ্গে ১৯টি জাহাজ ভিড়তে পারে আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে ৩০-৩৫টি জাহাজ ভিড়তে পারবে। কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে বাঁকের কারণে জেটিতে জাহাজ আসাকে যথেষ্ট ঝুঁকি নিতে হয়। বিপরীতে বে টার্মিনালে সরাসরি জাহাজ ভিড়তে পারবে।

শুধু তাই নয়, বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পৌঁছতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে হয় এর বিপরীতে বে টার্মিনাল জেটিতে ভিড়তে লাগবে মাত্র এক কিলোমিটার। এ ছাড়া বে টার্মিনালে পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে পারবে।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটি থেকে এনসিটি পর্যন্ত অপারেশনাল এরিয়ার পরিমাণ ৪০০ একর; আর বে টার্মিনাল প্রথম দফায় নির্মিত হবে প্রায় ৯০০ একর জমির ওপর। পর্যায়ক্রমে বে টার্মিনালের আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে দুই হাজার ৫০০ একর; যা চট্টগ্রাম বন্দরের ছয় গুণ।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেছেন, বন্দরের আওতায় বলেই এটিকে টার্মিনাল বলা হচ্ছে, মূলত এটি পরিপূর্ণ বন্দর। অবস্থানগত কারণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা বে টার্মিনালে নেই বলেই বিশ্বসেরা বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছে না। এটা আমাদের জন্য সত্যিই গর্বের। এখন সরকারের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে টার্মিনালটি চালু করে বন্দরের পণ্য ওঠানামার প্রবৃদ্ধি সামাল দেওয়া।

সূত্র জানায়, বিশ্বসেরা চীনের চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংস কম্পানি লিমিটেড (সিএমপোর্ট) ২০১৭ সালের মে মাসে জিটুজি পদ্ধতিতে বে টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি তারা বিল্ড অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওটি) পদ্ধতিতেও প্রকল্প নির্মাণ এবং ৫০ বছরের কনসেশন চুক্তি সম্পন্ন করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের প্রস্তাবনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ধরা হয়েছে তিন-চার বছর। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে দুই বিলিয়ন ডলার।

বন্দর পরিচালনায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কম্পানি সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল বে টার্মিনাল নির্মাণের চেয়ে পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রস্তাবে পিএসএ বলছে, বন্দর যদি জমির মালিক হয় তবে তারা দীর্ঘ মেয়াদে টার্মিনাল অপারেশনের চুক্তিতে যেতে আগ্রহী। আর বন্দর যদি জমির মালিক ও টার্মিনাল অপারেটর হয় তবে তারা যৌথভাবে অপারেশনের কাজটি করতে আগ্রহী। তবে প্রকল্পের অন্যান্য কাজ যেমন সাগরের ব্রেক ওয়াটার ধরে রেখে, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে তারা আগ্রহী নয়।

পোর্ট পরিচালনায় বিশ্বের আরেক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ডেনমার্কের আরেক শীর্ষ কম্পানি এপিএম টার্মিনালসও প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল বিওটি পদ্ধতিতে নির্মাণ করতে আগ্রহ দেখিয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার চাইলে তারা বে টার্মিনাল পরিচালনায়ও আগ্রহী।

কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডিও করেছে। কোরিয়া বে টার্মিনাল প্রকল্পটি কনসেশন কন্ডিশন লোন পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে কোরীয় সরকার ১৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ বার্ষিক ০.০১ শতাংশ সুদে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ দেবে। ৪০ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

এই চার দেশ ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে ভারত। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের যে ঋণচুক্তি হয়েছে, সেই ঋণচুক্তি থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল নির্মাণে বিনিয়োগের বিষয়ে একটি দফা যুক্ত করা হয়েছে।

তবে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনালের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকার আগাচ্ছে। কারণ অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাব বিবেচনায় তারা এগিয়ে আছে।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত পতেঙ্গা থেকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছন হয়ে রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগর তীর ঘেঁষে সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় এই বে টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। ৮৯০ একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালে; কিন্তু জমি বুঝে পেতে বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চার বছর সময় লাগল বন্দরের। গত ৩০ অক্টোবর ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর জমি বন্দরকে বুঝিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ