প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাতিসংঘ এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় না

কালের কন্ঠ : বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চলতি নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দিলেও অনুকূল পরিবেশ না থাকার উল্লেখ করে জাতিসংঘ কার্যত এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে এখনো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এ থেকেও ইঙ্গিত মেলে যে রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর আলাদাভাবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এ দুই দেশের কেউ এ মাসে প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে সংস্থাটিকে জানায়নি। তা ছাড়া জাতিসংঘ মনে করে, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিসাপেক্ষে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া-না যাওয়াটা রোহিঙ্গাদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত বছরের ২৪ আগস্ট রাত থেকে সামরিক বাহিনীর অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত প্রায় সোয়া সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে গত মঙ্গলবার ঢাকায় দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিবকে পাশে রেখে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক চলতি নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটিকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের আশা প্রকাশ করেন। সেদিন রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার নভেম্বর মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু করতে রাজি হলেও এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সিদ্ধান্তে পৌঁছার খবর তাঁরা দেখেছেন। ইউএনএইচসিআর শরণার্থী ইস্যুতে নেতৃত্ব দেয়। প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।

স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা অপরিপক্ব বা দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিতে পারি না। অনুপ্রবেশকারীরা যখন মনে করবে যে ফেরার পরিবেশ আছে এবং ফেরার সময় হয়েছে তখনই তাদের ফেরা-না ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘ইউএনএইচসিআরের মতে, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো ফেরার মতো অনুকূল নয়। আর একই সময় আমরা দেখতে পাচ্ছি, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের আসা (বাংলাদেশে) অব্যাহত রয়েছে। এ থেকে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ইঙ্গিত মেলে।’

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আন্দ্রে মেহেসিক গতকাল বুধবার জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর সংস্থা রাখাইন রাজ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। তবে সেখানে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। তিনি বলেন, রাখাইনের তিনটি টাউনশিপে রোহিঙ্গা ও অন্য মুসলমানরা বেশ কষ্টের শিকার হচ্ছে। চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধের কারণে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাও দেখা দিয়েছে। সেখানে ভয় ও অবিশ্বাসের মনোভাব বিদ্যমান।

এদিকে গতকাল কক্সবাজার সফর করে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চলতি নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের নেতা ও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব মিন্ট থোয়ে। এ সময় রোহিঙ্গারা তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ ছয়টি দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জমিজমা ফেরত প্রদান, নির্যাতনের বিচার, নিজ বসতভূমিতে থাকার ব্যবস্থা করাসহ তাদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে ঘোষণা করা।

মিন্ট থোয়ে এসব দাবি তাঁর সরকারের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দেন। পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নানসহ দুই দেশের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে মিন্ট থোয়ে গতকাল কক্সবাজারে সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম দফায় দুই হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নেবে মিয়ানমার। দেশটির সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উইন মিন্টও গতকাল নেপিডোতে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। প্রতি সপ্তাহে ১৫০ জন করে রোহিঙ্গা মংডু টাউনশিপের কাছে নাকুড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাবে।

মিয়ানমার প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও শতাধিক রোহিঙ্গা নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জামালিকা নামের এক রোহিঙ্গা নারী মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা আমাদের বর্বর নির্যাতন করে দেশত্যাগ করিয়ে দিয়েছেন। আমরা ফিরে যাব আমাদের দেশে। তবে ‘রোহিঙ্গা’ নামেই যাব। আমাদের ‘বাঙালি’ বলা যাবে না। সেই সঙ্গে আমাদের বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমিও ফিরিয়ে দিতে হবে।”

প্রতিনিধিদলকে উদ্দেশ করে হামিদ হোসেন নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমরা ফিরে গেলে আমাদের তিন দিনের বেশি ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা যাবে না। ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি ফিরিয়ে দিতে হবে।’

সাংবাদিকদের ব্রিফিং করার পর আশ্রিত হিন্দু রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মিন্ট থোয়ে আলাপ করেন। সফর শেষে প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় ফিরে আসে।

অন্যদিকে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যাবাসন শুরুর আগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। অনেকে বলেন, এক সপ্তাহ আগেই যেখানে জাতিসংঘ তদন্ত দলের প্রধান মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলছে বলে দাবি করেছেন, সেখানে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরুর সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী ও ভয়ংকর।

প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনসহ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবিতে রোহিঙ্গাদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডের ছবিও গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।