প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজনৈতিক সংলাপে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি

মহসীন কবির : জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময় সংলাপে বসছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। নির্বাচনের আগে সংলাপ ছাড়াও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ হয়েছে।

এরশাদের সংলাপ
১৯৮৪ সালের ৯ এপ্রিল বঙ্গভবনে সাত দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। তখন সাত দলের পক্ষ থেকে ৩৩ দফা দাবিনামা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সংলাপ ফলপ্রসূ না হওয়ায় সাত দলের নেতারা সংলাপকক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন।

এরপর ১০ এপ্রিল বঙ্গভবনে জামায়াতের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এরশাদ। ১১ এপ্রিল ১৫ দলের নেতাদের সঙ্গে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সংলাপ হয়েছিল। এর একদিন পর ১২ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার একান্ত বৈঠক হয়। ১৪ এপ্রিল বঙ্গভবনে এরশাদের সঙ্গে ১৫ দলের দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। ২৮ এপ্রিল বঙ্গভবনে আবারও আরও ১০ দলের সঙ্গে সংলাপ হয় এরশাদের।

এরশাদের সঙ্গে দ্বিতীয় সংলাপ
১৯৮৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি এরশাদ। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সেই সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর কিছুদিন পর ২৮ অক্টোবর তখনকার সরকারের দুই বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ রাজনৈতিক সমস্যা নিরসনে আবারও আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনীতিকদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাননি।

১৯৯৪ সালের তত্ত¡াববধায়ক সরকারের দাবি
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারও আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেলে ১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের দুই উপনেতার মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। এছাড়া ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের বৈঠক হয়। উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার। তখনকার কমনওয়েলথ মহাসচিব এনিয়াওকুর এমেকা রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ওই বছরের ১৩ অক্টোবর ঢাকায় এসে দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কমনওয়েলথ মহাসচিবের মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংলাপে দুই নেত্রী আনুষ্ঠানিক সম্মতিও দিয়েছিলেন। পরে সেটিও সফল হয়নি।

১৯৯৫ সালে সংলাপ
১৯৯৫ সালে আবার বিরোধীদল সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই বছরের ১৮ ফেব্রæয়ারি বিরোধী দলের সেই সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তদানীন্তন শাসকদলীয় অন্যতম শীর্ষনেতা ও সংসদ উপনেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারি একতরফা নির্বাচন করলেও পরে আওয়ামী লীগসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তত্ত¡াবধায়ক সরকার বিল পাস করে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরকার।

জিমি কার্টারের সংলাপ
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগের সেটি প্রত্যাখ্যানের কারণে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। তখন সেই সংকট নিরসনে বাংলাদেশে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। তিনিও দুই পক্ষের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। কিন্তু তার চেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি।

২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংলাপ
২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সংলাপে বসেন। সেসময় নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সংলাপ হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ দফা তুলে ধরা হয়। কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে ছয় দফা বৈঠক করেও মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। অবশেষে দুজনই তাদের দলের শীর্ষনেত্রীর কাঁধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সংলাপ শেষ করেন।

২০১৪ সালে তারানকোর সঙ্গে সংলাপ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসে বিএনপি। সংকট নিরসনে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকায় এসেছিলেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি ৬ দিন ঢাকায় অবস্থান করে দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সরকার ও বিরোধী দলের বৈঠক হয়েছিল ১০ ও ১১ ডিসেম্বর। ওই দুই দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তারানকো। তৃতীয় বৈঠক হয় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে। কিন্তু কোনও বৈঠকই সফল হয়নি।

সর্বশেষ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ সাত দফা দাবিতে সরকারকে আলোচনায় বসার জন্য ২৯ অক্টোবর চিঠি দেয়। ৩০ অক্টোবর সংলাপে বসার সম্মতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনকে চিঠি দেন। ১ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাতটায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বিকল্প ধারার সঙ্গেও সংলাপে বসছে আওয়ামী লীগ। আগামী ২রা নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। ৩০ অক্টোবর বিকল্প ধারার সভাপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংলাপের আমন্ত্রণ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি পাঠান। এরপর রাতেই সংলাপের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে বি. চৌধুরীর বাসায় যায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। দলটির নেতা হাছান মাহমুদ ও অসীম কুমার উকিল আমন্ত্রণপত্রটি পৌঁছে দেন। হাছান মাহমুদ বলেন, বিকল্প ধারার সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২রা নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিকল্প ধারাকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ