প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কী হবে কাল!

অনলাইন ডেস্ক : বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ কাল বৃহস্পতিবার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব বিএনপিসহ বিরোধী পক্ষের মধ্যে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংলাপের অতীত ইতিহাস সুখকর না হওয়ায়, কী হচ্ছে কাল এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মধ্যে। সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন গণভবনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ সংলাপের দিকে।

সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে রোববার চিঠি দেওয়া হয়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণভবনে ড. কামাল হোসেনকে দাওয়াত দিয়ে চিঠি দিয়েছেন মঙ্গলবার। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সংবিধান সম্মত সব বিষয় আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত।

এদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা উদার মন নিয়েই সংলাপের জন্য সম্মত হয়েছেন। তিনি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সংবিধানের মধ্যে থেকে আলোচনা করার কথা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান ও সদিচ্ছার কথার জানান দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টের যেসব দাবি সংবিধানের মধ্যে রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হবে। কারণ আওয়ামী লীগ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আন্তরিক। এজন্য গেল টার্মেও প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নির্বাচনকালীন সরকারে যে কোনো মন্ত্রণালয় দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। একই সঙ্গে গুলশানে তার কার্যালয়ে দেখা করতে গেলেও দরজা না খোলায় প্রধানমন্ত্রী সংলাপে না বসার সিদ্ধান্ত নেন। আর এবার যেহেতু ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের একটি দল হচ্ছে বিএনপি, তাই এবার তাতে আপত্তি দেননি। বরং সংলাপে রাজি হয়ে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সমালোচনা বন্ধেরও রাস্তা তৈরি করে ফেলেছেন।
জানা গেছে, সংলাপে আওয়ামী লীগ নিজেদের লাভ দেখছে। এজন্য শুধু ঐক্যফ্রন্ট নয়, অন্য দলগুলোর সঙ্গেও সংলাপ করার বিষয়ে আগ্রহী। বিকল্পধারার সঙ্গে ২ নভেম্বর সংলাপ হবে। বিকল্পধারার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দেওয়া হলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দ্রুতই সাড়া দেওয়া হয়। মঙ্গলবার রাতে সংলাপের চিঠি নিয়ে বিকল্পধারার সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজার বাসায় যান আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ ও অসীম কুমার উকিল। পাশাপাশি সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বাম জোটও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিষয়গুলোর বাইরে অন্য বিষয়গুলোও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে বলেও মনে করে আওয়ামী লীগের শীর্ষমহল। এ ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্ট যদি সংলাপে আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে চায় সেই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার ঘাটতি থাকবে না।

এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় সংলাপ চেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং সাধারণ সম্পাদক বরাবর দুটি চিঠি দেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। চিঠির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য সংযুক্ত করা হয়। সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে ডেকেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে। মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৮টায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই দাওয়াতের চিঠি নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় যান আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি নির্ধারণে বিকালে ড. কামালের নেতৃত্ব বৈঠকে বসেন তারা। বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, বিএনপির পাশাপাশি গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য এবং ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেবেন।

তবে তালিকায় কারা আছেন তাদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গণভবনের সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলে দলনেতা হিসেবে থাকবেন ড. কামাল হোসেন। এছাড়া বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও মির্জা আব্বাস, নাগরিক ঐক্য থেকে মাহমুদুর রহমান মান্না ও এসএম আকরাম, গণফোরাম থেকে মোস্তফা মহসিন মন্টু ও সুব্রত চৌধুরী, জেএসডি থেকে আ স ম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন ও তানিয়া রব, ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে সুলতান মনসুর, আ ব ম মোস্তফা আমিন ও স্বতন্ত্র হিসেবে থাকবেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আ স ম আবদুর রব বলেন, সংলাপে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ৭ দফার ভিত্তিতে আলোচনা হবে। এর মধ্য দিয়ে আলোচনার দ্বার খুলবে। দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে আলোচনা হতে হবে। তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনসহ আমরা সব বিষয় নিয়েই কথা বলব। সংবিধান তো জনগণের জন্য। তাই জনগণের ভোটাধিকার যাতে নিশ্চিত হয়, সেটাই আমাদের দাবি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো সংলাপ ব্যর্থ হয় না, একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কেউ কিছু বললে সেটা ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্য হবে না বলেও জানান তিনি। এর আগে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, শেখ হাসিনাকে বলব, আমরা খোলা মন নিয়ে কথা বলতে এসেছি, কোনো দলীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমি বলব জাতীয় স্বার্থে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা যেমন চাই, আপনিও চান… আমরা উভয়েই সেটা চাই, তাহলে কেন উপায় বের করা যাবে না!’ তিনি বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমেই বোঝা যাবে সরকার কতটা করার জন্য প্রস্তুত, কোন কোন ইস্যুতে তাদের দ্বিধা আছে।’
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারি দলের সংলাপে খোলামেলা আলোচনা হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য আলোচনার টেবিলে তোলা হবে। আলোচনার টেবিলেই সিদ্ধান্ত হবে। ঐক্যফ্রন্টের কিছু দাবি সংবিধানসম্মত নয়, সে ক্ষেত্রে কী হবে প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা (ঐক্যফ্রন্ট) তাদের দাবিতে অটল থাকবে, না সরে আসবে, দেখেন না কী হয়!’ ঐক্যফ্রন্টের বাইরে এই মুহূর্তে অন্য কোনো দলের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ নেই বলে জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

খালেদা জিয়ার রায়ের কোনো প্রভাব সংলাপে পড়বে কি না জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এ থেকেই বোঝা যাবে, এই সংলাপ কতটুকু আন্তরিক এবং এই সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে। জনমনে যে জিজ্ঞাসা ও প্রশ্ন, সেটা অবশ্যই আসবে।’ সংলাপে যাবেন কি না এ প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সেটা এখনই বলতে পারছি না। আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’ একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ করে অনুষ্ঠিত করা এবং সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া ও তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ঐক্যফ্রন্টের যদি নির্বাচন করার ইচ্ছা থাকে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সদিচ্ছা দলটির নেতারা ব্যক্ত করেন তাহলে নিশ্চয় এই সংলাপের মধ্য দিয়ে একটা পথ তৈরি হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, ‘রোববার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের সই করা একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়। তা আমি অফিসিয়ালি গ্রহণ করি। সেই চিঠির জন্য প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ দিয়েছেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে একটি অফিসিয়াল বক্তব্য আমার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের কাছে পাঠিয়েছেন।’

সংলাপ পর্যবেক্ষণে রাখছে বাম জোট : জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সংলাপে বসার খবরকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখলেও এই সংলাপ যেন দুই পক্ষের ‘ক্ষমতা ভাগের’ জন্য না হয়Ñ সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বাম গণতান্ত্রিক জোটের আয়োজনে এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। বাম জোটকে আলোচনায় না ডাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সিপিবি সভাপতি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলে আমাদের যে আরও অতিরিক্ত দাবি আছে সেগুলোও আলোচনার সুযোগ হতো। আমরা সতর্ক দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি, কারণ সংলাপের নানান নমুনা আছে।’ (তথ্য সূত্র :আলোকিত বাংলাদেশ)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ