প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঐক্যফ্রন্টের মতে সংবিধান মেনেও সমাধান সম্ভব

সমকাল : সংবিধান অনুযায়ী সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সরকার সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় কি-না- সেটাই বড় বিষয় হিসেবে দেখছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আন্তরিক হলে সংবিধানের মধ্যে থেকেই ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার দু-একটি ছাড়া প্রায় সব দাবিই মানা সম্ভব। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে বহুল আলোচিত সংলাপে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

একই সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ‘ফলপ্রসূ’ সংলাপের স্বার্থে একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ পেছানোর দাবি জানাবে ঐক্যফ্রন্ট। দীর্ঘ এক দশক পর ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী জোটের এ সংলাপের সূচনায় রাজনীতির বরফ কিছুটা হলেও গলতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন জোটের নেতারা। কোনোভাবেই সরকারি দলের কোনো ‘ফাঁদে’ পা দেবে না ঐক্যফ্রন্ট। বরং সরকারি দলের কোর্টে বল ছুড়ে দেওয়ার কৌশল নেবে। সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আলোচনার সূত্রপাত করার অনুরোধ করবেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তারা কী করতে চান সেটা আগে পরিস্কার করতে বলবেন। তারপর তাদের সাত দফা দাবির সপক্ষে যুক্তি দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন।

সংলাপের প্রস্তুতি ও অংশ নেওয়া নেতাদের নাম চূড়ান্ত করতে গতকাল মঙ্গলবার ঐক্যফ্রন্টের সিনিয়র নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠক শেষে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, এ সংলাপের মাধ্যমে আগামী দিনের একটি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সাত দফাসহ অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা হবে।

গতকাল ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনকে দেওয়া চিঠিতে ‘অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সংবিধানসম্মত সব বিষয়ে আলোচনার জন্য আমার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত’ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়ে গতকাল বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আলোচনায় সরকার সংবিধানের বিষয়গুলোকে তুলতে চাইবে; কিন্তু এই সংবিধানকে তো তারাই সংশোধন করেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যাপারগুলো যোগ করেছেন। সংবিধান এবং আইন পরিবর্তন তো কোনো ব্যাপারই না, এক মিনিটেই তা হতে পারে। তাছাড়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে দাবি তারা দিয়েছেন, সেটা একেবারেই নতুন কিছু নয়। অবশ্যই নির্বাচন সংবিধানসম্মত হবে, অসাংবিধানিকভাবে তো নির্বাচন করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে সংশোধনী থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

অবশ্য বর্তমান সংবিধানের মধ্যে থেকে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব কি-না- সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, সরকার সংবিধান মেনে চললে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। তবে নির্বাচনকালীন দলীয় সরকার আইন, সংবিধান এবং নৈতিকতা মানে না বলেই অবাধ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তবে সংলাপের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি উচ্চ আদালতে জোটের অন্যতম শরিক কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা আরও সাত বছর বাড়ায় বিস্মিত ও হতাশ নেতারা। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের তোড়জোড়ে এই রায়ের কোনো প্রভাব পড়বে কি-না জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ থেকেই বোঝা যাবে, এই সংলাপ কতটুকু আন্তরিক এবং এই সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে। জনমনে যে জিজ্ঞাসা ও প্রশ্ন, সেটা অবশ্যই আসবে।

সংবিধানের উদ্ৃব্দতি দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের এক সিনিয়র নেতা দাবি করেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই সংবিধান সংশোধন না করেও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প আছে। সংবিধানের ১২৩-এর ৩(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ রেখে নির্বাচন করা যাবে। ১২৩-এর ৩(খ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা যাবে। সরকার বলছে, সংসদ রেখে নির্বাচন করবে। ঐক্যফ্রন্ট বিকল্পটা চাচ্ছে।

ঐক্যফ্রন্ট নেতা আরও দাবি করেন, নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার আকার প্রধানমন্ত্রী যতজন নির্ধারণ করবেন ততজন থাকবেন। এখন ৬০ জন আছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে একশ’ করতে পারেন। আইনগত কোনো বাধা নেই এবং সেটা সংবিধানসম্মত। তবে প্রথা হলো, বাড়িয়ে নয় কমিয়ে দেবেন। ১২৬ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের অনেক ক্ষমতা আছে। কমিশন তার ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ করবে। সে ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টের সব দাবি পুরোপুরি পূরণ না হলেও নির্বাচনের জন্য সহনীয় ‘লেভেল প্লেয়িং’ তৈরি হবে। সংসদ ভেঙে দিলে স্বাভাবিকভাবে ওই সময় যে সরকার থাকে সেটি না থাকাটাই স্বাভাবিক। অন্যান্য দেশে যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে সেখানে প্রথা রয়েছে- সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকে। আর ওই সরকার বড় বড় কোনো কাজ করবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সাত দফার ভিত্তিতেই সংলাপে কথা বলবেন। তারা মনে করেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া সাত দফা দাবি সংবিধানের মধ্যে থেকেই বাস্তবায়ন সম্ভব। সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছাই হলো বড় বিষয়।

অবশ্য ঐক্যফ্রন্টের সিনিয়র নেতারা দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, একমাত্র নির্দলীয় সরকার গঠনের দাবি ছাড়া বাকি সব দাবিই বর্তমান সংবিধান সংশোধন না করেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সংসদ বাতিলের দাবিও সংবিধানের মধ্যে থেকে মানা সম্ভব।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংবিধানের মধ্যে থেকেও অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ বের করা সম্ভব। আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনায় বসলে বিদ্যমান সংবিধানেই অনেক কিছু করার আছে।

ঐক্যফ্রন্টের নেতারা জানান, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিলেই সম্ভব- এমন নজির অতীতেই রয়েছে। যেমনটি হয়েছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুল আজিজ এবং তৎপরবর্তী একাধিক কমিশনারের ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রপতি তাদের চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়ায় তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও রাষ্ট্রপতির হাতেই সুযোগ রয়েছে। ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়।

বিএনপি নেতাদের মতে, দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারামুক্তি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। ইতিপূর্বে নিম্ন আদালতে সাজা হওয়া সত্ত্বেও অনেক রাজনীতিবিদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সরকারের বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও এমন সদস্য রয়েছেন।

সর্বাধিক পঠিত