প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংলাপের উদ্যোগ রাজনীতির জন্য সুবাতাস

বাংলা ট্রিবিউন : সংলাপের উদ্যোগকে দেশের রাজনীতির জন্য সুবাতাস বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সংলাপের অতীত অভিজ্ঞতায় খুব আশাবাদী না হতে পারলেও তারা মনে করেন, এই সংলাপের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ তাদের অনমনীয় অবস্থান থেকে বেশ সরে এসেছে। রাজনৈতিক দলসহ দেশবাসীর মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বে হলে সংলাপ এতটা সহজ হতো না। নেতৃত্বে ড. কামাল হোসেন থাকায় সরকারের তরফ থেকে দ্রুত সাড়া এসেছে। বিএনপিও ড. কামালকে সামনে রেখে কিছুটা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটি পথ পেয়েছে।

সংকটের সমস্যা সংকট দিয়ে নয়, সংলাপ দিয়েই হয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা বাতাসের দোলা। তবে আমাদের সংশয় হচ্ছে এই বাতাসটি কতদিন, কতক্ষণ বহমান থাকবে? কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সংলাপের সফলতার কথা বলে না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে এবারের সংলাপও সফল হবে না। আমরা প্রত্যাশা করি সংলাপ সফল হোক এবং নির্বাচনমুখী একটি পরিবেশ সৃষ্টি হোক। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক। যদি দুই পক্ষ ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসে তাহলে অবশ্যই ভালো কিছু হবে।’
সংলাপ নিয়ে নানা দিক থেকে নানা ধরনের অশান্তি সংকেত দেখতে পাচ্ছেন মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘যদিও গণতন্ত্রের কথা বলছেন, কিন্তু ড. কামাল হোসেন তো বলতে গেলে বিএনপির সাত দফা ও ১১ দফার ফেরিওয়ালা। তিনি গণতন্ত্রের কথা বলে যাদের সঙ্গে জোট গঠন করেছেন, অতীতে তারা গণতন্ত্র দিতে পেরেছে কিনা, সেটা তো বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সবকিছুর পরও আমি সংলাপ নিয়ে আশা করতে চাই। সংলাপের চূড়ান্ত পরিণতির আগে আমি নেতিবাচক মন্তব্য করতে চাই না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সংলাপকে প্রত্যাশিত ও অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সংলাপের ফলে দুটি দলের মধ্যকার দূরত্ব কিছুটা কমেছে। যেভাবে দুই পক্ষ অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, তাতে দেশটা সংঘাত ও অচলবস্থার দিকে যাচ্ছিল, সেখানে সংলাপ আশার আলো দেখাচ্ছে।’

বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়োগে গঠিত সার্চ কমিটির সদস্য সৈয়দ ইসলাম বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন অনেক পোড় খাওয়া মানুষ, পুরনো রাজনীতিবিদ। আর তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের সংলাপ হবে। আর এ জন্যই সংলাপটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। বিএনপি সরাসরি এলে এতটা সহজ হতো বলে আমার মনে হয় না।’

তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা খাটিয়ে এই সংলাপটাকে সঠিক পরিণতিতে নিতে পারে, আর আওয়ামী লীগও দলের সাবেক নেতা হিসেবে তার ওপর আস্থা রাখে তাহলে ভালো কিছুই পাবো বলে প্রত্যাশা করি।’
অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দলই খোলা মন নিয়ে আলোচনার কথা বলেছেন। আমরা যেখানে ধরেই নিয়েছিলাম কোনও প্রাপ্তি আসবে না, সেখানে ১০ বা ২০ শতাংশ প্রাপ্তি এলেও সেটাও কম কী? আর সংলাপের একটি ধারাবাহিকতা থাকে। হয়তো প্রথম বসায় কিছুটা হলো বা মনোমালিন্যই হলো। তবে আবারও একটি সংলাপের সম্ভাবনা থাকে। আমাদের প্রধান প্রত্যাশা নির্বাচনটা সুষ্ঠু হোক, সবার অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনটা হোক।’

প্রধানমন্ত্রীর সংবিধানের মধ্যে থেকে আলোচনা করার প্রসঙ্গটি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সংবিধানের মধ্যে থাকার কথা বলেছেন সেখানে হয়তো নির্বাচনকালীন সরকার বলে তারা যেটা চাচ্ছেন, তা হবে না। তবে তিনি হয়তো টেকনোক্র্যাট কোটায় তাদের একাধিক মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নিয়োগ করে একটা জায়গায় আসার চেষ্টা করবেন।’
সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করে এই বিশ্লেষক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আবারও ক্ষমতায় আসার হয়তো একটি আত্মবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। নির্বাচনে জিতবেন বলেই বিএনপি বা অন্যরা শ’খানেক আসন নিলেও তার যায়-আসে না। বরং অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে এবং সংসদে বিএনপিকে পেলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিকে একধরনের চাপের মধ্যেই ফেলে দিয়েছে। এখন তাদের নির্বাচনে আসাটা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে গেছে। তারা সংলাপে এসে যদি বেরিয়ে যায়, সেটাও তাদের জন্য ভালো হবে না। আর বিপরীত দিক থেকে বলতে চাইলে বলা যায়, ঐক্যফ্রন্টকে সামনে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার একটা সুযোগ খুঁজছিল, সেটা হয়তো তাদের হয়ে গেছে। দলটি ধরপাকড় ও গায়েবি মামলা থেকেও বেরিয়ে আসতে পারবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সংলাপের উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়। আমি মনে করি, এই সংলাপ দেশের অস্থিরতা উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে এই ক্ষেত্রে দুইটি বড় দলকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সংলাপে গিয়ে স্বার্থের বিষয়ে গোঁ ধরে থাকলে চলবে না। উইন-উইন সিচ্যুয়েশনের জন্য উভয়কে ছাড় দিতে হবে। আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুপক্ষই ভালো নির্বাচন চায়। এক্ষেত্রে এই সংলাপটা সেই ভালো নির্বাচনের ক্ষেত্র তৈরি করলো।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেফারুজ্জামান বলেন, ‘সংলাপের তথ্যটি আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক সংবাদ। দেশবাসীর এর থেকে অনেক কিছুই আশা করতে পারেন।’

বাস্তবে সংলাপের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘সংলাপটা পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদাবোধ, একে অপরের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে নমনীয়তার ওপর এর সফলতা নির্ভর করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা সংলাপেই বড় ধরনের কিছু আশা করাটা কঠিন। এটা সূচনামাত্র। এই সূচনা যদি সুন্দর হয় তাহলেই মানুষ খুশি হবে। এই সংলাপের মাধ্যমে বিদ্যমান বৈরিতা না বাড়ে সেটাকেই আমি সফলতা বলবো।’

সর্বাধিক পঠিত