Skip to main content

শরতেই শীতের গরম পিঠা

মাহফুজ নান্টু: এখন কার্তিক মাস। শীত আসতে এখনো আরো মাস দেড়েক বাকি। তবে এখনই সন্ধ্যা নামলে গ্রামের মেঠো পথে আর গভীর রাতে নগরীতে কুয়াশার আস্তরণ চোখে পড়ে। শীত এখনো না আসলেও শরতের মাঝামাঝি সময়েই এখন নগরীর প্রধান সড়ক ও অলি-গলিতে শীতের পিঠাপুলির পসরা সাজিয়ে বসছেন মৌসুমি পিঠা বিক্রেতারা। ক্রেতা সমাগমও বেশ ভালো। ধোঁয়া উঠা গরম ভাপা-চিতই পিঠার সাথে মুখরোচক সিদল ও সরিষার ভর্তায় পিঠা স্বাদ আস্বাদন করতে পিঠার দোকানে ভীড় করছেন ভোজন রসিকরা। কেউবা দিনের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে স্ত্রী সন্তানদের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন গরম ধোঁয়া উঠা পিঠা। গত কয়েকদিন ধরে কুমিল্লা মহানগরীর প্রধান সড়ক ও অলি-গলির পাশের খোলা স্থানে শতাধিক মৌসুমি পিঠা বিক্রেতাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। বিকেল হলেই শুকনো কাঠ-বাঁশ মাটির চুলায় দিয়ে তপ্ত আগুনে মাটির তৈরি পাতিলে পিঠা বানানো শুরু করেন পিঠা বিক্রেতারা। বিশেষ করে ভাপা ও চিতই( আঞ্চলিক ভাষায় খোলা পিঠা বলে পরিচিত) পিঠাই বেশী তৈরি ও বিক্রি করতে দেখা যায়। নগরীর ডিসি সড়ক এলাকায় শীতের শুরুতে পিঠা বানানো ও বিক্রি শুরু করছেন মৌসুমি পিঠা বিক্রেতা মাসুদকে। মাসুদের অবর্তমানে তার ছোট ভাই সুমনও পিঠা বানানো ও বিক্রির কাজ করেন। পিঠা বিক্রি ছাড়াও তারা মৌসুমি ফেরীওয়ালা হিসেবে আয় রোজগার করে পরিবার চালান। গ্রামের বাড়ি জেলার দেবিদ্বার উপজেলায় হলেও রেইসকোর্স এলাকায় ছোট খুপড়ি ঘরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। কথা হয় পিঠা বিক্রেতা মাসুদের সাথে। তিনি জানান, বছরের বিভিন্ন সময় ফল-তরকারী বের হয় সেগুলো ফেরী করেন। তবে শীত আসলে শুধু পিঠা তৈরি ও বিক্রির কাজ করেন। পিঠা বানানোর জন্য দিনের বেলায় চালের গুড়া, নারকেল-গুড় ও চিতই পিঠার সাথে ভর্তা পরিবেশন করতে সিদল ও সরিষার ভর্তা বানানোসহ কেরোসিন-শুকনো বাঁশ কাঠ সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন। এ কাজে তার স্ত্রী ও মেয়ে সহযোগিতা করেন। পড়ন্ত বিকেলে শুরু হয় পিঠা বানানো ও বিক্রির কাজ। গরম গরম পিঠা ও ভর্তা ছোট প্লাস্টিকের প্লেটে করে ক্রেতাদের সামনে পরিবেশন করেন। দৈনিক পিঠা বানানোর খরচ গড়ে এক হাজার টাকার মত লাগে। পিঠা বিক্রি শেষে ব্যয় বাদে গড়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকা মুনাফা করেন। প্রতিটি ভাপা ও চিতই পিঠা পাঁচ টাকা করে বিক্রি করেন । মাসুদের দোকানে পিঠা খেতে এসে আবদুস সালাম নামে এক ব্যবসায়ী জানান, ব্যস্ততার কারণে বাসায় পিঠা বানানোর অনুষঙ্গ নিতে পারি না বলেই মাসুদের দোকানে এসে পিঠা খাই। আর যাওয়ার সময় স্ত্রী সন্তানদের জন্যও নিয়ে যাই। ধোঁয়া উঠা ভাপা পিঠা মুখে পুরে দিয়ে তৃপ্তি নিয়ে ব্যবসায়ী আবদুস সালাম বলেন, আমাদের ছোটবেলায় শীতের সকালে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা বানানো হত। পৌষ-মাঘ মাসজুড়ে আমরা উৎসবে মেতে থাকতাম। আল্লা চাউল(আতপ চালে)’র গুড়া দিয়ে ভাপা-চিতই পিঠা খাওয়ার আনন্দ ছিলো অন্য রকম। এখন পিঠা কিনে খাই। ভালো লাগে। তবে আগের সে স্বাদ গন্ধ এখন আর পাই না। তবুও আসি পিঠা খেতে। নগরীর-রেইসকোর্স,শাসনগাছা,ঝাউতলা,ফৌজদারী,বাদুরতলা,কান্দিরপাড়,রাজগঞ্জ,চকবাজাররানীর বাজার,টমসমব্রিজ এলাকায় শতাধিক মৌসুমি পিঠা বিক্রেতাকে পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতে দেখা যায়। রেইসকোর্স এলাকায় পিয়ারা বেগম নামে একজন পিঠা বিক্রি করেন। পিঠা ক্রেতাদের কাছে পিয়ারা খালা নামে পরিচিত তিনি। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ তার অফিস শেষ করে চলে এলেন পিয়ারা বেগমের কাছে। শহরে ভাড়া বাসায় পিঠা তৈরি করার সরঞ্জাম সংগ্রহ করা কঠিন হয়। তাই এখন পিঠা কিনে খেতে হয়। হাতে একটি ভাপা পিঠা খেতে খেতে শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ জানান, শৈশবে আমরা নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে বাংলা বর্ষপঞ্জির তখন পৌষ মাঘ মাসের কুয়াশা ঘেরা শীতের সকালে রান্না ঘরের চুলার পাশে বসে পিঠা খাওয়া ছিলো রীতিমতো উৎসবের ব্যাপার। এছাড়াও খেজুরের রস দিয়ে পায়েস সিন্নির স্বাদ এখনো জিবে লেগে আছে। আফসোস নিয়ে বলেন, এখন সময়ের পরিবর্তন এসেছে। পিঠা এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি ও বিক্রি হয়। তবে খেজুরের রসের পায়েস সিন্নি এখন আর চোখে পড়ে না।

অন্যান্য সংবাদ