প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেখ হাসিনার সফলতা এবং ঐক্যফ্রন্টের ড. কামালদের সংলাপ

দীপক চৌধুরী: স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতিতেও মাঝেমধ্যে চমক দেখান। সম্ভবত এ কারণেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ। এই সংলাপ কিন্তু বিএনপির সঙ্গে নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে তাঁর শতভাগ আন্তরিকতার প্রমাণ মেলে। গুজব, সন্ত্রাস, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ও অসৎ রাজনীতির পরিণতি তিনি জানেন। আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী ৬৬ শতাংশ মানুষ তাঁকে সমর্থন করে। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনিস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে এখন ৬৪ শতাংশ মানুষ সমর্থন করছে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক আইআরআই চলতিবছর ১০ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালনা করেছিল। এও শোনা যায় যে, শেখ হাসিনাই টানা তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আমরা জানি, সফল রাজনীতিবিদ ছাড়াও তিনি একজন জনপ্রিয় লেখক। অবশ্যই আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের সভাপতির ব্যস্ততা অনেক বেশি। তারপরও লেখক হিসেবে শেখ হাসিনার প্রাণবন্ত উপস্থিতি আমরা পেয়ে থাকি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রন্থগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, দেশ জনগণ ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনাগুলো লেখনীর মাধ্যমেই তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র্যদূরীকরণ ঃ কিছু ভাবনা, জনগণ ও রাজনীতি, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, ওরা টোকাই কেন, পিপল এন্ড ডেমোক্রেসি এবং বিপন্ন গণতন্ত্র লাঞ্ছিত মানবতা এই গ্রন্থগুলো পাঠ করলে আমরা অন্য এক দুঃসাহসী ও আত্মবিশ্বাসী শেখ হাসিনাকে পাই।

জীবনভর সাধ্যের সবটুকু আপনজনকে দেওয়ার মধ্যে কেউ কেউ আনন্দ পান। চারপাশের সবার জন্য উজাড় করে দেয়ার মানুষ আমরা দেখেছি। আবার এর উল্টো চরিত্রও দেখেছি। স্বাধীনতার পর ভুরিভুরি রাজনৈতিক চরিত্রহীন দেখেছি আমরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণকে উজাড় করে দিয়ে গেছেন। স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন দেশ। তাঁর আন্দোলন সংগ্রাম ছিল মানুষের জন্যই যা শেষপর্যন্ত জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন এই বাংলায়। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা চাননি। চেয়েছেন জনগণের সুখ। অধিকার প্রতিষ্ঠা। এর ঠিক উল্টো চরিত্রের অধিকারী ছিল খুনি মোস্তাক। তার ছিল ক্ষমতার লোভ। তার দল ডেমোক্রেটিক লীগের নেতা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। যিনি এখন জেলে। ‘বড় ঐক্যের আনুষ্ঠানিক যাত্রার’ সময় তিনি ছিলেন মুক্ত। সেদিন ছিল ২১ সেপ্টেম্বর।

মহানগর নাট্যমঞ্চের ওই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে গিয়েছিলাম। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুলও বক্তব্য দিয়েছিলেন ঐক্যের অনুষ্ঠানে। কী যে হলো হায়। মাঝপথে ঐক্য থেকে ‘ছিটকে’ গেলেন বিকল্পধারার সভাপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ‘রাজনীতির সাম্প্রদায়িক মানুষ’ বি চৌধুরীর ২০০১-এর ‘সাবাস বাংলাদেশে’র কথা ভুলতে পারবো না। একহাতে গীতা আর অপর হাতে কুরআন ধরে বক্তব্য দিতেন তিনি। এটি সে সময় বিটিভি ও একুশে টিভি প্রচার করতো। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবাক হওয়ার মতো অপপ্রচার। মানে নৌকার গীতা আর ধানের শীষের কুরআন। এখন স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে না তাদের সঙ্গে ঐক্য নয়। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ঐক্য চাই।’ অথচ সেই সময় বি চৌধুরী যে সরকারে ছিলেন সেই বিএনপি-জামায়াত সরকারেই ছিল মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী। যাদের ফাঁসি হয়েছে। এটা পরিষ্কার দেখা যায়, ভোটের রাজনীতি দ্ভুাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে আওয়ামী লীগ আর অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গি। বাস্তবে মানুষের চোখে তাই দৃশ্যমান হয়। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিএনপির ব্যারিস্টার মওদুদ, মির্জা আব্বাস, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম সাহেবরা বলে থাকেন, ‘৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন এ দেশে আর হবে না এবং হতে দেওয়া হবে না। এই ভয়ে সরকার বিএনপিকে কোণঠাসা করতে চায়। যাঁরা নির্বাচনে ভূমিকা রাখবেন, তাঁদের কারাগারে রাখতে চাচ্ছে।’ আসলে এসব কথা চর্বিত চর্বণ। কে চায়, ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন এ দেশে হোক? আর যদি এ সরকারকে বাধ্যই করা হয়, আরেকটি ‘পাঁচ জানুয়ারি’ করাতে তাহলে কী আওয়ামী লীগ মুখে আঙ্গুল দিয়ে চকলেটের মতো চুষবে? পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান আছে। সমাধান হয় আন্তরিকতায়। তর্ক করে হয় না, ঠা-া মাথায় সমস্যার সমাধান করতে হয়। তর্ক করে কেউ জয়ী হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বিএনপি গায়ের শক্তি দিয়ে তর্ক করছে, দফা দিয়ে তর্ক করছে এখনো। বিএনপি তো সংসদেই নেই। সুতরাং এবার দলটিকে নির্বাচনে যেতেই হবে। জনগণকে ‘গিনিপিগ’ বানানোর রাজনীতি এদেশে অচল। বাস্তবে আমরা তো দেখি, গোছানো আওয়ামী লীগ। এলো মেলো বিএনপি। বঙ্গবন্ধুর দোয়া শেখ হাসিনার ওপর আছে। রাজনীতি ও অর্থনীতির সাফল্যের পুরোভাগেই তিনি। তিনি দলের নেতাদের নিয়ে প্রতিমাসে বৈঠক করছেন। বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরেই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বসছেন। হয়ে উঠছেন সাংবাদিকবান্ধব। রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক ও প্রশাসনের বিষয়ে নিজের অভিমত তুলে ধরছেন। সাফল্যের পুরোভাগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের বিচার, ফ্লাইওভার নির্মাণ, সমুদ্র সীমানা বিজয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফলতা, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা, বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাপ্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, কৃষিতে সফলতা ইত্যাদি। এমন হাজারটা উন্নয়নের কথা উদাহরণ হিসেবে বলা যাবে। ছিটমহল সমস্যার সমাধান ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। একসময় এটিকে জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া বলতেন ‘আওয়ামী লীগের গোলামী চুক্তি’। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ়প্রত্যয়ের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেই শুনি। মনে রাখা দরকার, তিনি জাতির জনকের কন্যা বলেই ড. কামালের নেতৃত্বধীন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে রাজি হয়েছেন। কারণ, তিনি শান্তি চান, অশান্তি নয়। তফসিলের আগেই সংলাপের কথা শুনে আওয়ামী লীগবিরোধীদের ভাবে ‘গদগদ’ হওয়ার কিছু নেই।

রাজনীতির প্রসঙ্গে আসি। শুনেছি এবার নাকি ২১০ আসন আনতে চায় আওয়ামী লীগ। এরমধ্যে তরুণ প্রার্থীই ৭০জন। জাপাকে দেবে ৪৫টি আসন। ১৪ দলকে আলোচনার মাধ্যমে আসন দিতে চায় দলটি। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার মাথায় সারাদেশের সাংগঠনিক চিত্র। নির্বাচন সামনে, দরোজায় কড়া নাড়ছে। সময় একদম নেই। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। তবে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোট এখনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়নি। নভেম্বরের শুরুতে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ডিসেম্বরের তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলেও জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে মনে হয়েছে মারাত্মক সংকটে রয়েছে বিএনপি। কারণ, দলটির নেতারাও নাকি জানেন না, শরিকদের কত সিট দিতে হবে। ভাগাবাগির সিদ্ধান্ত নাকি আসবে লন্ডন থেকে। এর মানে কী? সর্বনাশা কথাবার্তা। শুক্রবার গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনী এলাকা ও সাংসদদের অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে করা একাধিক জরিপ প্রতিবেদনও রেখেছেন তাঁর কাছে। কিন্তু বিএনপি নামের দলটি এখনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি নেতাদের কী ভূমিকা এখন রাখা উচিৎ। ঐক্যের পরামর্শে আসন ভাগাভাগির এই দুরুহ কাজটি হলে তা বিএনপির তরুণপ্রার্থীরাই মেনে নেবে না। দলটির পরিকল্পনা বুমেরাং হবে। নির্বাচনের তারিখ পেছানোর পরিকল্পনা সুফল বয়ে আনবে না। বিএনপির এই কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে জাতীয় ঐক্য।

লেখক : উপ-সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক

সর্বাধিক পঠিত