প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তিতাসের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদকের কোন অগ্রগতি নেই

শাহীন চৌধুরী: বেশ কিছুদিন যাবৎ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির দুর্নীতি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা। এজন্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বদলীও হয়েছেন অনেকেই কিন্তু তিতাসের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদকের কার্যক্রমে তেমন কোনও অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বারবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদলের কারনে তদন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না।

তিতাসের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক এমডি থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সিবিএ নেতারাও রয়েছেন। কিন্তু দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে কাগজপত্র সংগ্রহ ছাড়া তেমন অগ্রগতি হয়নি। সূত্র মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ, সীমার অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিতাসের গাজীপুর ও টঙ্গী অঞ্চলের শীর্ষ কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয় ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে। প্রাথমিক পর্যায়ে তদন্তের দায়িত্ব ছিল উপপরিচালক আহমারুজ্জামানের। প্রেষণে দুদকে আসা এই কর্মকর্তা কয়েক মাস আগে পদোন্নতি পেয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানে যান। নতুন অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদকের আরেক উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। দলের অন্য দুই সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান ও মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ। দলটি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেপ্টেম্বরে দুই দফায় তিতাসের পাইপলাইন ডিজাইন বিভাগের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সাব্বের আহমেদ চৌধুরী এবং ইলেকট্রিক্যাল কোরেশন কন্ট্রোল (ইসিসি) বিভাগের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দফায় তলব করেন। কিন্তু তাঁরা হাজির হননি। এরই মধ্যে আবারও অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন করে নতুন করে উপপরিচালক মো. মনজুর আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল গঠিত হয়।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সাব্বের আহমেদ চৌধুরী গাজীপুর বিক্রয় অঞ্চলে এবং মো. আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান টঙ্গী উত্তরের সিস্টেম অপারেশন বিভাগের ব্যবস্থাপক থাকার সময়ে ঘুষ নিয়েছেন প্রধানত স্থাপনা পুনর্বিন্যাস, গ্রাহকদের অবৈধ গ্যাস-সংযোগ, গ্যাসের অবৈধ লোড বৃদ্ধি, অনুমোদন অতিরিক্ত স্থাপনা ব্যবহারের অবৈধ সুযোগ এবং পছন্দসই পদায়নকে কেন্দ্র করে। অভিযোগে খুদে বার্তায় ঘুষের আলাপের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে খুদে বার্তার রেকর্ড উল্লেখ করে বলা হয়, গাজীপুরে অবস্থিত এএমসি নিট কম্পোজিট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী প্রদীপ দাসের কাছ থেকে তিতাস কর্মকর্তা সাব্বের আহমেদ চৌধুরী পরিবার যে ঘুষ নিয়েছে, এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার একটি ঘটনা ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর ঘটে। ওই দিন সাব্বের-প্রদীপের খুদে বার্তাগুলোয় ৫০ লাখ টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে। একই ভাবে গাজীপুরের ভিয়েলাটেক্স লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান থেকেও সাব্বের আহমেদ ও মীর মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষের বিষয়টি উঠে এসেছে। অনুরূপভাবে মো. আবু বকর সিদ্দিকুর রহমানসহ সবুর, জাহাঙ্গীর, টেপা, নোমান ও কাদেরসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, মিটার টেম্পারিং ও মিটার বাইপাস করে গ্যাস–সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের আরও একটি অভিযোগ ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে অনুসন্ধান করছে দুদক। ওই অভিযোগে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সাবেক এমডি মীর মসিউর রহমানসহ আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। কিন্তু অসুস্থতার কথা জানিয়ে দুদকে হাজির হননি তাঁরা। এরই মধ্যে ৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ কর্মকর্তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশনে চিঠি দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর কয়েক দিন পরই অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন করে উপপরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরীকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিতাসের সিবিএ সভাপতি ও দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আলাদা আরেকটি অনুসন্ধান করছে দুদক। সিবিএ সভাপতি কাজীম উদ্দিনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ গ্যাস–সংযোগ ও মিটার টেম্পারিংসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাদেরকে গত সেপ্টেম্বরে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।
এ ছাড়া তিতাসের আরও অন্তত এক ডজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলমান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে অনেক সময় অভিযোগ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগের বিষয়গুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এ বিষযে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, অনুসন্ধান বা তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নানা কারণে কমিশন নানা বিচার– বিশ্লেষণ করেই এ পরিবর্তন করে। অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রয়োজনে কর্মকর্তা পরিবর্তন হতে পারে। এতে অনুসন্ধানে প্রভাব পড়ে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ