প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই শক্তি মদমত্তদের সামলান প্লিজ

বিভুরঞ্জন সরকার : সম্প্রতি গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ ৮-দফা দাবিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট ডেকে সারাদেশে কোটি কোটি মানুষের জীবনে যে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কোনো যুক্তিতেই মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের এই কৌশল সমর্থন করা যায় না। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিভিন্ন রকম দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে। দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করাও দোষের কিছু নয়। দাবির ন্যায্যতা-যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই আসে মানা না-মানার প্রশ্ন।

পরিবহন শ্রমিকরা কোনো অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া, সুযোগ-সুবিধার জন্য নয়, ধর্মঘট ডেকেছে সড়ক পরিবহন খাতে নৈরাজ্য জিইয়ে রাখার জন্য, মানুষ হত্যার অধিকার পাওয়ার জন্য, বেপরোয়া আচরণ অব্যাহত রাখার জন্য। না, এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। সংঘটিত শক্তির জোরে সীমাহীন ঔদ্ধত্য দেখানো, সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো মোটেই বরদাশত করার মতো ব্যাপার নয়। এসব প্রশ্রয় দিলে নৈরাজ্য বাড়বে, খামখেয়ালিপনা চলতে থাকবে। পরিবহন শ্রমিকরা আন্দোলনের নামে মানুষকে জিম্মি করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তা সাধারণভাবে কোনো মহলেই প্রশংসিত হয় না।

এটা মনে করা হয় যে, সরকারের দুইজন মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং মশিউর রহমান রাঙার মদদ ও প্রশ্রয়েই পরিবহন শ্রমিকরা আইনের ঊর্দ্ধে ওঠার বেয়াড়াপনা দেখাতে পারছে। এটা চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায় না। শাহজাহান খান হয় শ্রমিক নেতা থাকবেন অথবা মন্ত্রী থাকবেন। মশিউর রহমানকেও হয় মন্ত্রিত্ব অথবা পরিবহন মালিকদের নেতৃত্ব দুইটার একটা বেছে নিতে হবে। দুইটি পদে একসঙ্গে থাকলে স্বার্থের দ্বন্ধ দেখা দেয়। এমন কি নিজের পদের মর্যাদা রক্ষা করাও সম্ভব হয় না। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে সড়ক পরিবহন আইনটি পাস হয়েছে। উল্লিখিত দুই মন্ত্রী মন্ত্রিসভায় কিংবা সংসদে আইনটির বিরোধিতা করেছিলেন কি? যদি না করে থাকেন তাহলে শ্রমিক ধর্মঘট ডাকা কি নৈতিকভাবে ঠিক হয়েছে? শ্রমিক নেতৃত্ব যদি অপরিহার্য হয়ে থাকে তাহলে শাহজাহান খানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করা উচিত ছিল। গাছেরটা খাওয়া এবং তলারটা কুড়ানোর সুযোগ পেয়ে তারা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি শুধু ওই দুই মন্ত্রীর অভিভাবক নন। আপনি দেশের সব মানুষর অভিভাবক। আপনি শুধু পরিবহন শ্রমিকদের স্বার্থ দেখেন না, আপনাকে দেখতে হয় দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ। বিশ্বাস করুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শ্রমজীবী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি দেশের সিংহভাগ মানুষের মনে কোনো দরদ বা সহানুভূতি নেই। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কেবল চালকরাই দায়ী নয় এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, চালকরা একটু অধিকমাত্রায় সতর্ক হলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব হয়। কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিকের বাড়াবাড়ি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে কোটি কোটি মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করা ঠিক কাজ হতে পারে না। পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতিতে শাহজাহান খানের মতো মানুষরা জরুরি হলেও তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের অনুরাগ থাকে না। এমন জনবিরাগ মানুষদের মন্ত্রী রেখে সরকারের কোনো লাভ হয় কিনা সেটা একটি বড় প্রশ্ন । খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের ঠাকুররা যেমন বঙ্গবন্ধুর জন্য আশীর্বাদ ছিল না, তেমনি শাহজাহান খানের মতো বিতর্কিত মন্ত্রীরাও শেখ হাসিনার সরকারের জন্য আশীর্বাদ বলে মনে হয় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা এটা জানি যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার নির্বাচিত না হলে দেশের উন্নয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে, শাহজাহান খানের মতো মন্ত্রীরা যদি জনপ্রত্যাশার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে অব্যাহতভাবে দাপট দেখিয়ে যেতে থাকেন তাহলে জনগণের মনে বিরূপতা তৈরি হয়। সেটা ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। মানুষ শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় মানে কিন্তু এটা নয় মন্ত্রীদের বাড়াবাড়িও মানুষ হজম করে নেবে।

৪৮-ঘণ্টা ভয়াবহ সড়ক-সন্ত্রাসে যে জনকষ্ট হয়েছে তাতে সরকার কি কোনোভাবে লাভবান হয়েছে? মানুষ তো সরকারকেই গালিগালাজ করছে। ৪৮-ঘণ্টার এই পরিবহন ধর্মঘটকে মানুষ সরকারি ধর্মঘটই বলছে। কারণ এর পেছনে দুইজন মন্ত্রী রয়েছেন বলে মানুষের বিশ্বাস এবং এটা ভিত্তিহীন নয়। প্রশ্ন উঠছে, বিরোধী দল যদি হরতাল বা ধর্মঘট ডাকতো তাহলে সরকার কি এমন নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতো? একদিনের ধর্মঘটে দেশের অর্থনীতির কতো বড় ক্ষতি হয়, পণ্য চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষকে কতোটা দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয় তা সরকারের তরফ থেকে প্রচার করা হয়। পরিবহন শ্রমিকদের ৪৮-ঘণ্টার ধর্মঘট কী দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করলো?

যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চান এই ৪৮-ঘণ্টায় পরিবহন শ্রমিকরা মন্ত্রীর আশকারায় যা করেছে তাতে তারাও যারপরনাই বিরক্ত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়া, হাসপাতালে যেতে না পেরে শিশুর মৃত্যু, মানুষের মুখে কালি মেখে দেওয়া, কলেজ ছাত্রীর পোশাকে কালি লেপ্টে দেওয়া এসব বর্বরতা, অসভ্যতার নিন্দা না করে কি পারা যায়?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সহকর্মীরা মানুষের মনের ভাষা পড়তে ও বুঝতে না পারলেও আপনি তা পারেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। আপনি মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো বোঝেন বলেই আপনার অবস্থান সব সময় মানুষের পক্ষে, সাধারণ মানুষের মঙ্গলই আপনার রাজনীতির লক্ষ্য। সেজন্য মানুষও আপনার সঙ্গে আছে। আমরা জানি, আপনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুননির্বাচিত না হলে দেশের উন্নয়নযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। আবার আমরা এটাও দেখছি যে নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টাও আছে। এই অবস্থায় জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয় এমন কিছু করা থেকে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই বিরত থাকা উচিত। মন্ত্রী-এমপি-নেতা কেউ যেন মানুষকে ক্ষুব্ধ করে না তোলেন। আপনার দলের সবারই ক্ষমতার উৎস আপনি। তাই সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করার রিমোট কন্ট্রোল আপনার হাতেই। আজ যারা শক্তি মদমত্ততার পরিচয় দিচ্ছে তাদের শক্তির উৎস যদি কর্তন করেন তা হলে তারা বুঝবে ‘কতো ধানে কতো চাল’। আর জনগণ বুঝবে আপনি তাদেরই লোক। তাই আপনার কাছে বিনীত আরজ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শক্তি মদমত্তদের সামলান!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ