প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কী হবে সংলাপে?

প্রিয় সংবাদ : বিএনপিসহ সমমনা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যানে অনড় থাকা আওয়ামী লীগের হঠাৎ সম্মতির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

২৯ অক্টোবর, সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসবে আওয়ামী লীগ। তবে সেই সংলাপ কখন, কোথায় হবে সে বিষয়ে কিছুই জানাননি তিনি।

এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংলাপের সম্মতি জ্ঞাপনের বার্তা পেয়ে পৃথক বৈঠক করেছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সন্ধ্যায় বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জানান, ‘গতকাল আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছিলাম। আজকে জানতে পারলাম তিনি আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সংলাপে বসার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা এ বিষয়টিকে স্বাগত জানাই।’

মওদুদ আহমদ আরও বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদেরকে এখনো কবে ও কোথায় সংলাপ হবে তা জানানো হয়নি। এগুলো জানলে আপনাদের (গণমাধ্যমকর্মী) জানাব।’

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যদি কালকেই আমাদেরকে সংলাপের জন্য ডাকেন, আমরা অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেবো। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে তো আর অসম্মান করা যায় না।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সংলাপের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে অনড় থাকা আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে সংলাপে সম্মতির বিষয়টি আগামীর রাজনীতির জন্য ‘মাইলফলক’ বার্তা বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শেষ পর্যন্ত কার্যকর সংলাপ হবে তো? নাকি নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত সংলাপের পরিণতির দিকে যাবে! নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির (আব্দুল জলিল-আব্দুল মান্নান ভূইয়া) মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। তেমনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিবের সহকারী ফার্নান্দেজ তারানকোর নেওয়া উদ্যোগের ফলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে সংলাপের মতো ফের লোক দেখানো আরেকটি প্রহসনের সংলাপ হবে?

বিভিন্ন আলোচনা সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি অর্থবহ সংলাপের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে চিঠি দেওয়া হয়। আগামীকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করার কথা থাকলেও সন্ধ্যায় সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়। মূলত সংলাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাড়া দেওয়ায় মঙ্গলবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছেন না।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আগামীকাল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের নির্বাচন কমিশনে যাওয়ার কথা ছিল। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী সংলাপের জন্য সাড়া দিয়েছেন, তাই আমরা এ মুহূর্তে কমিশনে যাচ্ছি না। কারণ সংলাপে তো নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য নিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও নির্বাচন কমিশন বরাবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ঘোষিত ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যসমূহ চিঠি আকারে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসতে আওয়ামী লীগের সম্মতি জ্ঞাপন সিদ্ধান্তের বার্তাকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বিএনপি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘চলমান সার্বিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একটি কার্যকর ও অর্থবহ সংলাপের বিকল্প নাই। গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় “আমার ভোট আমি দেবো” প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে বিশেষ প্রয়োজন সংলাপ আলোচনার।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিসহ দেশের প্রতিটি বিরোধী রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সমাজ, সুশীল শ্রেণি ও দেশের প্রতিটি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি “সংলাপ”। সে ক্ষেত্রে হঠাৎ সংলাপের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কি জন্য “ইউটার্ন” নিয়েছে, নাকি সত্যিকার অর্থে “অর্থবহ” সংলাপে সম্মতি হয়েছে, তা বিবেচনাধীন। কারণ অতীতের সংলাপ ইস্যুতে যেমন সফলতা আছে তেমনি ছলনার আশ্রয়ও দেখা গেছে। তাই এই মুহূর্তে সংলাপের ব্যাপারে এতটুকুই বলতে পারি। কখন, কোথায়, সংলাপের আয়োজন করা হয় তখন সেই পরিবেশ বলে দেবে সংলাপের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে।

দীর্ঘদিন সংলাপ না হওয়ার পক্ষে অনড় থাকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই। ধরে নেন সংলাপ আলোচনা তারই অংশ।’

সংলাপ ইস্যুতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘বিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের সঙ্গে দেশের সমগ্র জনগণের দাবি সংলাপে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সম্মতি শুভ উদ্যোগ। আমরা সবসময় সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছি। তবে সেই সংলাপ অবশ্যই হতে হবে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সকল নিবন্ধিত ও সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে।’

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংলাপের সম্মতিকে ‘ইতিবাচক’ পদক্ষেপ আখ্যা দিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরে সরকারকে বলে আসছি সংলাপের মাধ্যমে একটি কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। কেননা গণতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যে কথা বলা হবে না, আলোচনা করা হবে না, তা কখনোই হতে পারে না।’

‘শেষ পর্যন্ত সরকারের বোধোদয় হয়েছে, তারা আলোচনার জন্য সম্মতিজ্ঞাপন করেছে। যা বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির জায়গা থেকে বলা যায় যে, আলাপ-আলোচনার জন্য একটি স্পেস তৈরি হলো। আমি মনে করি এই উদ্যোগ প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হবে। সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ ইস্যুতে আলোচনা করবেন, কথা বলবেন এবং তাদের (সরকার) যে কনসার্ন সেগুলো বিবেচনায় নেবেন।’

সাইফুল হক আরও বলেন, ‘সময় এখনো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচনি তফসিল দেওয়ার সময় হাতে আছে। আমি মনে করি সদিচ্ছা থাকলে খুব দ্রুত তিন-চার দিনের মধ্যে রাজনৈতিক অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। কাজেই সংলাপ শুধু নিছক আনুষ্ঠানিকতা হবে না, একটি কার্যকর উদ্যোগ হবে, আমরা বাম জোট সংলাপের ইস্যুতে যে সমস্ত কথা বলেছি, সরকার তা গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেবেন এবং সেই জায়গা থেকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বাস্তবে একটি জমিন তৈরি করবেন, উদ্যোগ নেবেন, যা আমরা দেখতে চাই। সংলাপ যাতে শুধুমাত্র প্রচারসর্বস্ব ও আনুষ্ঠানিকতা না হয়, আমরা সংলাপকে এমনটাই দেখতে চাই।’

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত