প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনা সব মন্ত্রিসভায়ই রাজাকার!

সোহেল সানি ॥

একমাত্র বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভা ছাড়া সব মন্ত্রীসভাতে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারের ঠাঁই হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে আত্ম পরিচয়ের খোলস পাল্টে অর্ধশতাধিক ব্যাক্তি রাষ্ট্রপ্রধানের পদসহ স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী হয়ে জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে চড়েন। মুসলিম লীগ জামায়াত প্রভৃতি দল স্বনামে রাজনৈতিক অধিকারই ফিরে পাওয়া শুধু নয়, এসব দলের শতাধিক নেতা এমপি হয়ে বসার সুযোগ পান সংসদে। বিগত বিএনপি সরকারের শরিক হিসাবে জামায়াতের আত্মপ্রকাশ স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসাবে প্রথম। মন্ত্রীত্বলাভের মাধ্যমে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ জামায়াতের শরিকানা প্রতিষ্ঠা করেন।

অপরদিকে, ‘৯৬-‘০১ শেখ হাসিনা সরকারের দুই প্রতিমন্ত্রী মওলানা নূরূল ইসলাম ও একে ফায়জুল হকও স্বাধীনতা বিরোধী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। গত দশকের শুরুতে নির্বাচনের ঢামাঢোলে স্বাধীনতাবিরোধীদের কেউ কেউ খোদ আওয়ামী লীগের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও সুযোগ পান। বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মুখে বিএনপি দাবি করে আসছে বর্তমান শেখ হাসিনার মহাজোট মন্ত্রিসভায়ও ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ রয়েছে। মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপিদের মধ্যেও সাবেক মন্ত্রীসহ কয়েকজন স্বাধীনতা বিরোধী রয়েছেন।

উল্লেখ্য, এসব স্বাধীনতা বিরোধী সাবেক মন্ত্রীদের অধিকাংশই আর বেঁচে নেই। তারা রাজনীতির বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেন কখনো বিএনপি বা কখনো জাতীয় পাটিতে। এদের দলছুটের সংখ্যায় আনুপাতিক হারেও আধিক্যতা রয়েছে।

জিয়া-সাত্তারের বিদায় এবং এরশাদের উদয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের আরেক ধাপ এগিয়ে নেয়। রীতিমত দলবদল করে এরশাদের মন্ত্রিসভায় স্থান করে নেন স্বাধীনতা বিরোধী এম এ মতিন, শামসুল হুদা চৌধুরী, এস এম শফিউল আজম। ৮৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা নতুন করে হলে মন্ত্রী হন বিচারপতি একে এম নরুল ইসলামের মতো স্বাধীনতা বিরোধী। তিনি ধর্ম এবং আইনমন্ত্রীর পদ পান। যুদ্ধকালীন ডা. এ এ মালিককে পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর পদে শপথ পড়ানো বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী উপদেষ্টা হিসাবে অভিষেক ঘটান।

এরশাদের মন্ত্রীত্ব লাভ করেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী , নাজিমউদ্দীন আল আজাদ, রাজিয়া ফয়েজ , আবুল হাসনাত, বিএম আব্বাস এটি, সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, ফারুক রশীদ চৌধুরী, কোরবান আলী. মনসুর আলী সরকার, এম মতিউর রহমান , মাহবুবুর রহমান, আব্দুল হামিদ খন্দকার .ব্যারিস্টার রাবেয়া ভুইয়া, আনোয়ার জাহিদ ও ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর মতো বির্তকিত নেতারা। এর মধ্যে বিচারপতি নূরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি হয়ে চমকও দেখান।

খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ৯১ সালের ১৯ মার্চ মন্ত্রী হন , মীর্জা গোলাম হাফিজ, আব্দুস সালাম তালুকদার, আব্দুল মতিন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। স্পিকার থেকে রাষ্ট্রপতি হন জিয়ার পাটমন্ত্রী আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ডেপুটি স্পিকার হুমায়ুন খান পন্নীও ছিলেন স্বাধীনতা বিরোধী। খালেদা জিয়ার সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় সরাসরি জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী কৃষি এবং সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হিসাবে পাঁচবছর রাজত্ব করেন। এর বাইরে বিএনপিরও একাধিক মন্ত্রী বির্তকিত ছিলেন স্বাধীনতা বিরোধী হিসাবে।সেই তালিকা দীর্ঘ। সাবেক সেসব মন্ত্রীদের মধ্যে এখন বিচারেরর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন জিয়া সরকারের মন্ত্রী আব্দুল আলীম, এরশাদেও মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী অন্যতম। স্বাধীনতা বিরোধীরা জিয়া এবং এরশাদ উভয় সরকারেরই মন্ত্রীত্ব করেন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাদের ইতিমধ্যে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

শেরেবাংলার একমাত্র পুত্র ফায়জুল হক ‘৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ২৫ মার্চের গণহত্যাকে সমর্থন করে তিনি দলের সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্ন করেন। স্বাধীনতার পর তার গণপরিষদ সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া হয়। ‘৭৯ এর সংসদ নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে এমপি হন। জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার রাষ্ট্রপতি হলে ফায়জুল হক প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এরশাদের শেষ সময়ে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে । ‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগে ফিরে এসে এমপি এবং পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন। ২০০৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সেসব মৃত মন্ত্রীদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগে যোগদানের সুযোগ পান। তাদেও মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রয়াত উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম, সাবেক স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী, সাবেক উপমন্ত্রী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী প্রমুখ।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতা বিরোধীদের মধ্যে প্রথম সেই ভাগ্যবান ব্যাক্তি সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। মুক্তিযুদ্ধকালীন নরঘাতক ইয়াহিয়ার বাতিল করা ৭৯টি আসনের উপনির্বাচনের আয়োজনকারী পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই ব্যাক্তিটি। পাকিস্তান প্রত্যাগত বিচারপতি সাত্তার ‘৭২ সালে নিয়োগলাভ করেন স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি সরকারি বীমা কোম্পানীর চেয়ারম্যান পদে। সেই নিয়োগ সর্ম্পকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ তার শেখ মুজিবের শাসনকাল বইয়ে লিখেছেন, একাত্তরের উপনির্বাচনে বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারী সবাইকে দালাল আইনে সোর্পদ করা হলেও নির্বাচনের আয়োজনকারী বিচারপতি সাত্তারকে রাখা হয়েছিল বিচারের উর্ধ্বে । যে কারণে বিচার প্রারম্ভে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। জিয়া মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির এক নম্বর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ ৭২ সালে লিগ্যাল এইডের সম্পাদক হিসাবে দালাল আইনের গোঁজামিল নিয়েও প্রশ্ন করেছিলেন। বিচারপতি সাত্তারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না হলেও জিয়ার মন্ত্রিসভায় দায়িত্বপালন করেন একইসঙ্গে।

৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বীর উত্তম জেনারেল খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে দেশের প্রধান বিচরপতি এ এস এম সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর বিশেষ সহকারি হিসাবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে ওঠে বিচারপতি সাত্তারের। উপরাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেন ৭৭ সালের ৩ জুন জিয়ার ক্ষমত্গ্রাহণের পরে উপরাষ্ট্রপতি।

আব্দুর রহমান বিশ্বাস, শাহ আজিুজুর রহমান, ড. এম এন হুদা, মশিহুর রহমান যাদুমিয়া, আব্দুল আলীম, মীর্জা গোলাম হাফিজ, শামছুল হুদা চৌধুরী, বিচারপতি একে এম নূরুল ইসলাম, এস এ বারী এটি, বি এম আব্বাস এটি, কাজী আনোয়ারুল হক, ্ আব্দুর রহমান, এস এম শফিউল আজম, এম এ মতিন, এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, অংশু প্রু চৌধুরী, তৈমুর রেজা চৌধুরী, এ কে ফায়জুল হক, সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ, আব্দুল হামিদ , ব্যারিস্টার রাবেয়া খাতুন, মাহবুবুর রহমান, একেএম মাঈদুল ইসলাম, সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন, সৈয়দ মোহাম্মদ কায়ছার, কাজী আনোয়ারুল হক, বিএম আব্বাস এটি। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর স্বাধীনতা বিরোধী কাজী আনোয়ারুল হক এলজিআরডি এবং বি এম আব্বাস এটি বিদ্যুত ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা হিসাবে জিয়ার আনুকল্য লাভ করেন।

৭৭ সালের ৫ আগষ্ট পাট মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা হন এস এম শফিউল আজম। তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুখ্যসচিব ছিলেন। একই বছরের ১২ অক্টোবর তথ্য উপদেষ্টা হিসাবে শামসুল হুদা চৌধুরীর অধিষ্ঠান ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রচার প্রচারণায় এক মাইল ফলক। শফিউল আজম ও শামসুল হুদা চৌধুরী এরশাদ সরকারের মন্ত্রীত্ব করেন। হুদা এরশাদের দলে ভেড়ার আগে জিয়া-সাত্তারের আরেক মন্ত্রী এম এ মতিনকে নিয়ে পাল্টা বিএনপিও গঠন করেছিলেন মূল ¯্রােতের বাইরে। বিএনপি (হুদা -মতিন) বিলীন করে এরশাদীয় আর্দশে বিলীন হয়ে মন্ত্রীত্ব করেন তারা। মারা যাওয়ার আগে মতিন পাল্টা জাতীয় পার্টি এবং শামসুল হুদা চৌধুরী ‘০১ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে ময়মনসিংহের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।

৭৮ সালের ২১ এপ্রিল জিয়া রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণের পর যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন তাতে স্বাধীনতা বিরোধীদেও সংখ্যা বেড়ে যায়। চরম স্বাধীনতা বিরোধী চৈনিকপন্থী নেতা ন্যাপের একাংশের সভাপতি মশিহুর রহমান যাদুমিয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সমমর্যাদাসীন একটি ‘সিনিয়র মন্ত্রী’র পদ তৈরি করা হয় তার জন্য। মশিহুর রহমান সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বলাভ করেন ৭৮ সালের ২৯ জুন। মীর্জা গোলাম হাফিজও একই দিন ভুমিমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। ‘৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের পর স্পিকার নির্বাচিত হন। পাকিস্তান প্রত্যাগত কর্নেল (অব’) এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান একই দিন লাভ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ।

শামসুল হুদা চৌধুরী ৭৭ সালের ১২ অক্টোবর উপদেষ্টা হলেও প্রথমবারের মতো মন্ত্রীত্বলাভ করেন ৭৮ সালের ৬ জুন। তীব্র স্বাধীনতা বিরোধী এস এ বারী এটি ওদিনই শ্রম ওসমাজকল্যান মন্ত্রী হিসাবে অভিষেক ঘটান ওদিন।

একই দিনে শপথ নেওয়া বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল আলীম ও গণপূর্তমন্ত্রী আব্দুর রহমান ও একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী হিসাবে চিহিৃত। ‘৭০ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে জয়ী হওয়া অং শু প্রু চৌধুরী খাদ্য মন্ত্রী এবং রাজমাতা হিসাবে পরিচিত সরকারের পার্বত্যবিষয়ক উপদেষ্টা বিনীতা রায়ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কাজ করেন। ৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল জিয়া যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন তাতেও স্বাধীনতা বিরোধীর সংখ্যা নগণ্য ছিল না। বরং কুখ্যাত স্বাধীনতা বিরোধী বলে চিহিৃত শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ দিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী বলয়ের প্রভাব বিস্তার ঘটানো হয়। এই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান অর্থমন্ত্রী হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর ড.এন এম হুদা।

রেলমন্ত্রী আব্দুল আলীম, শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এস এ বারী এটি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান , ধর্মমন্ত্রী আব্দুর রহমান, ডাক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী, পাটমন্ত্রী আব্দুর রহমান বিশ্বাস বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল হক, বানিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান তৈমুর রেজা চৌধুরী ছিলেন প্রবল স্বাধীনতা বিরোধী। ৮০ সালের বানিজ্য প্রতিমন্ত্রী হওয়া তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী ও ৮১ সালের ৭ এপ্রিল আইন প্রতিমন্ত্রী হওয়া ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের মুক্তিযুদ্ধে ভুমিকা নিয়ে বির্তক রয়েছে।

৮১ সালের ৩১ মে বিচারপতি সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর অর্থমন্ত্রী ড. এন এম হুদা উপরাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেন। ২০ নভেম্বর পাঁচ বছরের মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হলে মন্ত্রিসভায় স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রভাব প্রতিপত্তি আরো বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী পদে যথারীতি শাহ আজিজ বহাল থাকেন। টেকনোক্রাট কোটায় আবারো জ্বালানী মন্ত্রী হিসাবে শপথগ্রহণ করেন কাজী আনোয়ারুলৈ হক। শামসুল হুদা চৌধুরী, আব্দুল আলীম, আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী আব্দুর রহমানের সঙ্গে মন্ত্রী হিসাবে যুক্ত হন গণপূর্তমন্ত্রী ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এ কে ফায়জুল হক , শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মওলানা আব্দুল মান্নান ডাক টেলিযোগিাযোগ ও বিমান প্রতিমন্ত্রী অং শু প্রু চৌধুরী ও পানি সম্পদ উপমন্ত্রী সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন প্রমুখ। এ এস এম মোস্তাফিজকে বানিজ্যমন্ত্রী করে সাত্তারের মন্ত্রিসভায় রাখা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদ পান ডা. এম এ মতিন। একে ফায়জুল হক ও সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত হয়ে গণপরিষদ সদস্য পদ হারান মুক্তিযুদ্ধের বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়ে। ৮২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির মন্ত্রিসভায় বড় রকমের রদবদল ঘটানো হয়। উপরাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগলাভ করেন বঙ্গবন্ধুর আমলের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ। যদিও প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রাখা হয় স্বাধীনতা বিরোধী শাহ আজিজকেই। এর বাইরে যথারীতি শামসুল হুদা চৌধুরী, এম এ মতিন, এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী এ ফায়জুল হক, সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন, অং শু প্রু চৌধুরী বহাল থাকলেও বাদ পড়েন অনেকে। এই মন্ত্রিসভায় স্থান পান টেকনোক্রাট হিসাবে আরেক স্বাধীনতা বিরোধী খন্দকার আব্দুল হামিদ। তাকে দেওয়া হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব। এরা সকলেই ২৭ নভেম্বর শপথ নেন।

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের হাওয়ায় বিচারপতি সাত্তার উপদেষ্টা থেকে উপরাষ্ট্রপতি হলে তার হাত ধরেই স্বাধীনতা বিরোধীদের একটা বড় অংশ জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ভিড় করে। সাত্তারের নেতৃত্বে জাগদল গঠিত হলে একাত্তরের বিবাদমান তিন মুসলিম লীগের নেতারা এক মুসলিম লীগে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেন।

‘৭৬ সালে ‘রাজনৈতিক দলবিধি’ আইনের আওতায় ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে মওলানা আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই নামেই তারা মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে ‘৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০টি আসনও লাভ করে। যার মধ্যে জামায়াতের ছিল ছ’টি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘৭৩ সালের ২১ এপ্রিল স্বাধীনতা বিরোধী অপকর্মের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার এক গেজেট নোটিফিকেশন জারী করে ৩৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করলেও পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের পর তারা পূর্নবাসিত হওয়ার সুযোগ পান। অনেকে নাগরিকত্ব ফিরেও পান। বহল বির্তকিত জামায়াতের প্রধান নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমও নাগরিকত্ব ফিরে পেতে সরকারের কাছে আবেদন জানান।

মায়ের অসুখের অজুহাতে তিনমাসের ভিসা নিয়ে ‘৭৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানী পাসপোর্টে বাংলাদেশে আসলেও ফেরেননি আর। ‘৯২ সালে প্রকাশ্যে জামায়াতের আমির হলে তার নাগরিকত্বের বির্তক ওঠে। সর্বোচ্চ আদালত নাগরিকত্ব বহাল রাখে। ৯৪ বছর বিবেচনা ক্ের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯০ বছরের কারাদন্ড দিলে রাষ্ট্রপক্ষ মৃত্যুদন্ডের জন্য আপিল করে। এতে তার আমৃত্যু কারাবাসের রায়ের পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সাংবিধানিকভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে রাজাকারদের দালাল আইনের আওতায় আনা হলেও সরকারি প্রশাসনে বহাল থেকে যায় স্বাধীনতা বিরোধীরা। বেসামরিক প্রশাসনের মতো সামরিক প্রশাসনেও চলে একই নীতি। সামরিক বাহিনীতে ঢালাওভাবে ফিরে আসার সুযোগ পায় পাকিস্তান প্রত্যাগতরা। স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থানগ্রহণের দায়ে যেমনিভাবে কাউকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হয়নি, ঠিক তেমনি বিচারিক কর্মে নিযুক্ত ব্যাক্তিদেরও রাখা হয় সবরকম বির্তকের উবের্ধ। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের সামরিক প্রশাসনে পদোন্নতিলাভের ক্ষেত্রে ‘প্রত্যাগতদের’ অপক্ষো দুই বছরের ‘সিনিয়রিটি’ দেয়া হলেও বেসামরিক প্রশাসন চলেছে তার আপন গতিতে। স্বাধীনতা বিরোধী হিসাবে যে ৩৯ ব্যাক্তি দেশের নাগরিকত্ব হারায় তারা সবাই রাজনৈতিক দলের নেতা, রাজাকার মন্ত্রিসভার সদস্য অথবা উপনির্বাচনে বিজয়ী এমএনএ ও এমপিএ। সামরিক বেসামরিক প্রশাসনে কে স্বাধীনতার পক্ষে আর কে বিপক্ষে তা নিরূপন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে নানা তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলেও এর কোন আইনী ভিত্তি ছিল না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ