প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জানার চেয়ে অজানাই তো বেশি!

ড. সেলিম জাহান : ‘চমকে তাকিয়ে দেখি, টুপ করে একটা কাগজের ছোট্ট দলা রিক্সার পা-দানিতে আমার পায়ের পাশে এসে পড়ল মৃদু শব্দে’, মৃদুস্বরে আমাকে তার কিশোরীবেলার গল্প বলছিলেন স্নেহভাজন একজন। ‘নীচু হয়ে তুলতে যাওয়ার আগেই দুরন্ত এক হাওয়া ঐ টুকরোটিকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো। আর তখনই আমার রিক্সার পাশ দিয়ে সাঁই করে এক যুবকের সাইকেল বেরিয়ে গেল। এক ঝলকের জন্য মানুষটি তাকালো আমার মুখের দিকে’, জানালার বাইরে নারকেল পাতায় রোদের ঝিকিমিকি দেখতে দেখতে ভারি নরম গলায় বলে সে। ‘আমি কিন্তু তার মুখ দেখতে পাই নি, জানি না সে কে?’ ভারি হতাশ শোনায় তার গলা।

‘কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা কি জানেন?’, বলে চলে সে আমার চোখে চোখ রেখে। ‘আমি কোনদিনই জানব না কি লেখা ছিল ঐ চিঠিতে। আমাকে কি বলতে চেয়েছিল ঐ অচেনা যুবক?’, গাঢ় ব্যাথিত হয়ে আসে তার গলা।

এ কথা শুনতে শুনতে বহুকাল আগের একটি স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ১৯৭৪ সালের কথা। সবে আমাদের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। তাতে আমার ফলাফল এবং সেসঙ্গে বিতর্কের কারণে রবি আমার তখন তুঙ্গে। ঠিক সেই সময়ে একটি মোড়ক আসে আমার বিভাগে আমার নামে। বারান্দায় বেরিয়ে মোড়ক খুলে দেখি একটি কবিতার বই – কবি আহসান হাবীবের ‘আশায় বসতি’। প্রচ্ছদ পাতার ওপরে বর্ষার জলবিন্দু ফোঁটা ফোঁটা। প্রথম পাতা ওল্টাতেই চোখে পড়ল গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘বড়ো আশা করে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও’। আর কিচ্ছু নেই।

ঐ বইয়ের রহস্যও ভেদ করা যায় নি কোনদিন- আমার অতি উৎসাহী কিছু বান্ধবদের সুতীক্ষ্ম গোয়েন্দাগিরি সত্ত্বেও। কে পাঠিয়েছিলেন, কেন লিখেছিলেন, কোন আশায় বসতি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন- কোনদিন জানা যাবে না।

আসলে জীবনে অনেক কিছু জানা হয়ে ওঠে না আমাদের- কতটুকুই বা জানা যায়? না, না, জ্ঞানের কথা বলছি না। এক জীবনে আর কতটুকু জ্ঞান লাভ করা যায়? স্বয়ং নিউটনই যদি সারাজীবন ধরে জ্ঞান-সাগরের তীরে বসে নুড়িই শুধু কুড়োন, আমরা তো তা’হলে তুচ্ছ! আর জ্ঞানের ব্যাপারে আমার উৎসাহ আছে, কিন্তু অতি জ্ঞানী হবার পাগলামী নেই।না জানার কথা যেটা বলছিলাম, তা আমাদের অতি প্রিয়জন, আশে-পাশের আপনজন, চারদিকে আমরা যা দেখছি শুনছি সে সম্পর্কে। অনেকদিন আগে কোন এক উত্তপ্ত তকের্র মুহূর্তে আবেগ-তাড়িত হয়ে আমার এক কন্যা আমাকে বলেছিল, ‘আমার জীবনের কতটুকু তুমি জানো?’ ত্রিশোর্ধ আমার তনয়ার তীক্ষ্ণ সে অনুযোগে প্রবল এক নাড়া খেয়েছিলো আমার পিতৃ হৃদয়। ঠিকই তো, আমি তার পিতা হতে পারি, কিন্তু ঐ মানুষটির বহু কিছুই তো আমার অজানা। তার প্রতিদিনের জীবন, তার কর্মকা-, তার সখ্যতার বলয়, তার চিন্তা-চেতনার বহু কিছুই তো আমার অজানা- জেনেছি কি সে সবকিছু পরতে পরতে? না, জানি নি। আমার আত্মজা আমার কাছে অজানাই থেকে গেল নানান দিকে।

মা-বাবার কথা খুব মনে হয়। মা-বাবা হিসেবেই ঐ দু’টি মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয়। কিন্তু তার আগে- যখনো তাঁরা আমার বাবা-মা হন নি? জানি কি কেমন ছিলেন আমার জনক-জননীরা শৈশবে, কৈশোরে, প্রথম যৌবনে?

আমার বাবা খুব স্বল্পভাষী ছিলেন- তাঁর চেয়েও কম কথা বলতেন আমার পিতামহী। আমার বাবার পূর্ব জীবনের কথা তাই অন্যদের কাছ থেকে শোনা আমার- তাও খুব বেশি নয়। কিছু শুনেছি, কিছু জেনেছি, বহুটাই জানি নি- জানতেও পারবো না সম্ভবত: আর কোনদিন।

কৈশোরে বাবা গ্রামের কোন স্কুলে পড়তেন, তা শুনেছি আমার পিতামহীর কাছে। ছোটবেলায় বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বিড়ি ধরেছিলেন, তা’ও জানা আছে আমার। কিন্তু কারা তার বন্ধু ছিলেন তা জানি না। পুরো নোয়াখালী ছেড়ে কেন তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বি.এ. পড়তে গেলেন, তাও জানি না। তবে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আমার শ্বশুরপিতা প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চোধুরী বাবাদের শ্রেণীতে টমাস হার্ডির ‘দ্য মেয়র অব কাসটারব্রিজ’ (ঞযব গধুড়ৎ ড়ভ ঈধংঃবৎনৎরফমব) পড়িয়েছেন, সেটা তাঁর মুখেই শুনেছি। পরবর্তীকালে দু’জনেই অবশ্য সহকর্মী হয়েছিলেন বরিশালে বি.এম. কলেজে।

আমার পিতামহকে আমি দেখি নি- আমার মা’ও দেখেননি। তাঁর কোন ছবি নেই। শুনেছি ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের এই ব্যক্তিটির রেংগুনে বড় ব্যবসা ছিল। কিন্তু আমার পিতামহের সঙ্গে আমার পিতার কেমন সম্পর্ক ছিল, কি কথা হতো তাঁদের মধ্যে, কতটা আদর করতেন আমার পিতামহ আমার পিতাকে- কোনদিনই জানতে পারি নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাঁর পুত্রকে দেখতে এসে কলেরায় আমার পিতামহের মৃত্যু ঘটে এবং আজিমপুর গোরস্থানে গণকবরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ঢাকায় এলে আমার পিতা সেখানে যেতেন একা- কোনদিন আমাকে বলেন নি তাঁর সঙ্গী হতে। কেন-তা’ও কোনদিন জানতে পারি নি।

১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে পরে আমার বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। পিতা হিসেবে প্রীত হতেই পারেন তিনি। এর কিছুকাল পরে এক বৈশাখী মেলায় রমনা উদ্যানে দেখা হলো অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জ্জীর কন্যা নীলিমা’দির সঙ্গে- বাবার ছাত্রী। ‘তুই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-স্যারের জন্য এটা যে কত গর্বের কথা, সেটা জানিস’?

জানতাম না, জানলাম তাঁর কাছ থেকে এক অশ্রুত গল্প শুনে- বাবার শিক্ষক জীবনের প্রথম দিকের ছাত্রী হয়ে যা তিনি জানতেন, পুত্র হয়েও আমি তা জানতাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করলেও বাবাকে বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হয় নি। কারণ বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক নিউম্যানের সঙ্গে তাঁর রেষারেষি। সে জায়গায় নিয়োগ পেয়েছিলেন তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত একজন। অনুমান করতে পারি, এটা কত বড় আঘাত ছিল আমার পিতার জন্যে। ‘বহুদিন আগের একটা অন্যায়ের শুদ্ধি হলো স্যারের কাছে- তোর নিয়োগের দ্বারা’, বুঝলি?, বলেছিলেন নীলিমা’দি। আমি পুরো কাহিনী শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম- জানতাম না এর কিছুই।

কিশোরী বয়সে আমার মা’র বিয়ে হয়েছিল। ছোট-খাটো মানুষটি, টক টকে ফর্সা রঙ, মাথায় ঢাল চুল কোমর ছাড়িয়ে। তাঁরও কৈশোরের তেমন কিছু আমি জানি না। শুনেছি, চার বোন ছিলেন তাঁরা- আমার মা সেজো। পিঠাপিঠি মেজো বোনের সঙ্গে মা’র লাগত প্রায়ই। তাঁদের দু’জনের তালা দেওয়া দু’টো টিনের বাক্স ছিল- দু’ কিশোরীর সব সম্পদসহ। দু’বোনে ঝগড়া হ’লেই এক অন্যকে লুকিয়ে অন্যের বাক্স ঝাঁকাতেন-যাতে ভেতরের সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়।

শুনেছি, কিশোরী বয়সে দু’বন্ধু ছিল আমার মায়ের- কমলা ও শমলা। মা বলতেন শমলা, আমার ধারনা এটা শ্যামলা হবে- কে জানে? জানি না কেমন করে মা-বাবার প্রথম দেখা হয়েছিল, ভয় পেয়েছিলেন কি মা, যখন কিশোরী তিনি রেল ও জলপথে স্বামীর সঙ্গে সুদূর নোয়াখালী থেকে বরিশালে এসেছিলেন আত্মীয়-স্বজন বিহীন একটি জায়গায়? কেমন করে পেতেছিলেন তাঁর প্রথম সংসার? জানা হয় নি অনেক কিছুই – জানা হবে না আর এ জীবনে। আসলে নিজেকেই বা কতটুকু জানি? যাপিত জীবনের প্রতিটি দিনের কথা কি মনে আছে? ঠিক ঠাক বলতে পারবো কি সব ঘটনা? তবুও একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বেশিটুকুই জানে সে নিজে- আর কেউ নয়। কিন্তু তারপরেও তো কথা থেকে যায়, বলতে ইচ্ছে করে, ‘আপনাকে জানা আমার ফুরাবে না’, এবং তার আগেই হয়তো জীবনই ফুরিয়ে যায়। সম্পাদনা : শরিফ উদ্দিন আহমেদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ