প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সে ঝড় আদৌ উঠবে কী?

মহিউদ্দিন খান মোহন : ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ও বিএনপি সংগঠিত নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে সাত দফা দাবি দিয়েছে, তার একটিও মানা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত শুক্রবার রাজধানীর দিয়াবাড়িতে নির্মানাধীন মেট্রোরেলের কাজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, সাত দফার এক দফাও মানা হবে না, এগুলো অযৌক্তিক। একই দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি না মেনে তফসিল ঘোষণা হলে দেশে আন্দোলনের ঝড় উঠবে।

আন্দোলনের সেই ঝড়ে আমরা আবারো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবো। একই নির্বাচনী এলাকার এ দুই তারকা রাজনীতিকের বক্তব্য এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফাকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ওবায়দুল কাদের জাতিকে কী মেসেজ দিতে চাচ্ছেন তা যেমন আলোচিত হচ্ছে, তেমনি ওইসব দাবি না মানলে বিএনপি কেমন ঝড় তুলবে বা আদৌ কোনো ঝড় তুলতে পারবে কিনা তা নিয়েও পর্যালোচনা হচ্ছে। তবে, একটি বিষয়ে অনেকেই একমত যে, তাদের এসব বক্তব্য-মন্তব্য আগামী দিনগুলাতে রাজনীতি সংঘাতময় হয়ে উঠার আভাস দিচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা একেবারেই অযৌক্তিক এ কথা কেউই মানতে নারাজ। কেননা, দফাগুলো বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে উত্থাপিত এবং দেশে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কথাকে যদি যৌক্তিক বলেও ধরে নেয়া হয়, তাহলেও কি সঙ্কট উত্তরণে কোনো পথ নেই? অবশ্যই আছে। তবে, সেজন্য প্রয়োজন ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা। তারা যদি সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আন্তরিক হন, তাহলে উপায় খুঁজে বের করা কঠিন কোনো কাজ নয়। স্মরণযোগ্য যে, ১৯৯৬ সালে ওবায়দুল কাদের সাহেবরা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, তখন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতারাও একই ভাষায় কথা বলেছিল। তারাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে অসাংবিধানিক, অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা মানতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি সরকার। কীভাবে সেটা সম্ভব হয়েছিল? এখানেই এসে যায় ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যের সারমর্ম। আজ তিনি যে ঝড় তোলার কথা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সহগামী জামায়াত-জাতীয় পার্টি সেদিন সে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে বিএনপি সরকার তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সে রকম কোনো ঝড় যদি বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা তুলতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি যেমন বদলে যাবে. কাদের সাহেবদের কথার ধরণও তখন পাল্টে যাবে।

কিন্তু মওদুদ সাহেবের কথিত ঝড় কী আদৌ উঠবে, যার পরিণতিতে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছেন? এটা ঠিক, গত কয়েকদিনের পরিবেশ তাদেরকে বেশ সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং সেই ফ্রন্টের ব্যানারে সিলেট ও চট্টগ্রামে দু’টি বড় সমাবেশ করতে পারায় মওদুদ সাহেবার এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছেন। কিন্তু সরকার যদি শেষ পর্যন্ত অনমনীয় থাকে তাহলে তারা কী করবেন? কথিত সে ঝড় তোলার জন্য কী মাঠে নামবেন? কিন্তু গত দশ বছরের ইতিহাস এ ক্ষেত্রে কাউকে আশাবাদী করে না। খোদ বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতাই মনে করেন, সরকার একটু ঢিলে দিয়েছে বলেই দুটি সমাবেশ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সরকার যদি আবার কঠোর অবস্থানে যায়, তখন?

বিএনপি নেতারা ভাবছেন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর রাজনীতির মাঠের চিত্র পাল্টে যাবে। তখন নির্বাচনকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকবে। তাই বিরোধী দলের ওপর আগের মতো জুলুম চালাতে পারবে না। তাদের এ ধারণা যে বাস্তবসম্মত নয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, নির্বানকালীন সরকারের নামেও ক্ষমতায় থাকবে আওয়ামী লীগ। ফলে প্রশাসনযন্ত্রের মনোভাবের খুব একটা হেরফের হবে এমনটি ভাবা বোধকরি ঠিক হবে না।

রাজনৈতিক অভিজ্ঞমহলের মতে, বিএনপির সামনে এখন দু’টি পথ খোলা আছে। এক. আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচনে অংশ নেয়া। দুই. নির্বাচন থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রাখা। কিন্তু নির্বাচন বয়কট করলে কী ধরণের খেসারত দিতে হয়, গত র্পাচ বছরে সে তিক্ত অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছে। ফলে তারা আবার ওই পথে যাবেন বলে মনে হয় না। তাহলে কী করবেন তারা? যে আন্দোলনের ঝড় তারা গত পাঁচ বছরে তুলতে পারেননি, পাঁচ সপ্তাহে তা তুলতে পারবেন সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আর এ সত্যটি জানেন বলেই ওবায়দূল কাদের সাহেবরা চড়া গলায় বলতে পারেন-‘একটি দাবিও মানা হবে না।’

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ