প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংসদ রেখে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না

ডেস্ক রিপোর্ট: মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান : বর্তমান সংসদের মেয়াদ আগামী ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালে শেষ হবে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) (ক) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৯ অক্টোবর ২০১৮ তারিখ থেকে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচন হতে হবে। সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের কাউন্ট ডাউন শুরু হবে ৩০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখ থেকে। হাতে এমনিতেই সময় কম। বিভিন্ন যুক্তিসংগত ও বাস্তব কারণে সরকারবিরোধীরা এখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তার ওপরে সরকার তাড়াহুড়ো করছে। এ পর্যন্ত নির্বাচনের তারিখের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কিছু বলছে না।

তবে প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন সংবিধান মোতাবেক সময়মতো নির্বাচন হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলে বেড়াচ্ছেন যে, ডিসেম্বর ২০১৮-এর মধ্যেই নির্বাচন হবে। আবার ইসি সচিব আগ বাড়িয়ে ডিসেম্বরে যেকোনো তিনটি তারিখে নির্বাচন হবেই বলে অনাহুত ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যদিও সংবিধান মোতাবেক সঠিক কারণ সংবিধান মোতাবেক ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে এবং তাই হবে। কিন্তু সেতু মন্ত্রী ও ইসি সচিবের আগ বাড়িয়ে অনাহুত তারিখ ঘোষণায় ‘ ডাল মে কুচ কালা’ মনে হচ্ছে।

ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়া মানে এক মাসের বেশি সময় হাতে থাকার পরেও নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। এক মাস আগে নির্বাচন হওয়ার হেতু কী? তা জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই প্রশ্নের আরও বড় কারণ হলো সংবিধানে ১২৩(৩) (ক) ধারা মোতাবেক নির্বাচনের বেলায় একটি সুস্পষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা হুবহু এখানে দেওয়া হলো ‘তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্য রূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ তার পরিষ্কার মানে হলো নতুন নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা বৈধ সদস্য হবেন না। বিষয়টি যথেষ্ট ঘোলাটে এবং সন্দেহজনক মনে হচ্ছে!

আগামী নির্বাচনে যদি কোনো দৈব দুর্ঘটনায় বর্তমান সরকারের পা পিছলায় তাহলে তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য নির্বাচন বাতিল করার সর্বময় কর্তৃত্ব তো রয়েই যাচ্ছে। তখন যে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা, জঙ্গি উত্থান প্রতিহত করা, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বিদ্যমান রাখা এবং সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ঐতিহাসিকভাবে দায়বদ্ধ থাকবে না তার গ্যারান্টি জনগণকে কে দেবে? যদি সরকার নির্বাচনের তারিখ ২০১৯ সালের জানুয়ারির ২৫ তারিখের পরে দেওয়ার চিন্তা করতো তাহলে অবশ্যই জনগণের মাথায় এই সরল সর্বনাশা সন্দেহ কখনোই আসতো না।

কিন্তু সরকার সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করতে চায়। এই প্রমাণকে আরও দৃঢ় করেছে ইসি সচিবের অনাহুতভাবে এবং আগ বাড়িয়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং বারবার দৃঢ়তার সঙ্গে একই কথা বলে যাওয়া। সরকারের এই পাতানো নির্বাচনে কোনো সচেতন ও গণবান্দব সৎ ও চরিত্রবান রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। তবে এখন তো আবার দেশে কোনো চরিত্রহীন লোক নেই বা থাকলেও বলা যাবে না! তবে যাই হোক, দেশে যদি কেউ অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন আশা করেন তাহলে সংসদ রেখে সে নির্বাচন আশা করা মরীচিকা ছাড়া অন্য কিছু হবে না।

সংবিধানে সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থাও সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩)(খ) উপ-অনুচ্ছেদে রাখা হয়েছে। উক্ত বিকল্প উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘(খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে”। তার মানে অনেকে হয়তো বলার চেষ্টা করবেন যে এই উপধারাটি সংসদের মেয়াদ যদি কোনো কারণে পূর্ণ না হতো তাহলে প্রযোজ্য ছিলো। কিন্তু অনেকের বক্তব্য হলো সংসদের মেয়াদ অবসানের ৯০ দিনের মধ্যে যদি নির্বাচন না হয় তাহলে ওই অবস্থায় সংবিধান কোনো কিছুই উল্লেখ করেনি। তার মানে ওই সময় নির্বাচন না হতে পারাটা সংবিধান লঙ্ঘিত হবে না বা কোনো সাংবিধানিক সংকট অথবা শূন্যতা সৃষ্টি করবে না। জনগণ এই সরকারকে ৪ বছর ৯ মাস চোখ বন্ধ করে মেনে নিয়েছে এবং বাকি ৩ মাসও মেনে নিবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে জনগণ চায় এই সরকার আগামী ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সন পর্যন্ত ক্ষমতায় বহাল তবিয়তে থেকে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে যেকোনো সময় বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে বলা হোক। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকুক বা যদি ইচ্ছে হয় তাহলে সরকার ভেঙে দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিরোধীদল থেকে ৫ জন টেকনোক্রেট মন্ত্রী নিয়ে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেও জনগণের কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে সংসদ রেখে নির্বাচনে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। দেশ যে ভাবে চলছে চলুক, জনগণের কথা কে ভাবে? উপায় যখন নেই তখন জনগণ সবই মেনে নিবে। দলের বাইরে জনগণের কোনো অস্তিত্ব নেই এবং আগামীতে মনে হয় আরও থাকবে না।

জনগণ চাইলেই কী আর না চাইলেই কী? সরকারকে বলবো নির্বাচন দিয়ে দেন। চরিত্রবান লোকের অভাব হবে না। নির্বাচনে অনেক চরিত্রবান লোক পাওয়া যাবে। জনগণ ছাড়া সবাই আসবে। ভগবান চরিত্রবানদের সহায়!

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

সর্বাধিক পঠিত