প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এই নৈরাজ্যের শেষ কোথায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

মঞ্জুরুল আলম পান্না : অনেক হয়েছে। দয়া করে এবার থামতে বলুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, থামতে বলুন নৌ-পরিবহনমন্ত্রীকে। অনেক ভালো কাজের পাশাপাশি আপনার সরকারের যতখানি সমালোচনা রয়েছে, সেই সমালোচনার অর্ধেকের জন্য দায়ী এক শাজাহান খান। কথায় কথায় দেশের মানুষকে জিম্মি করছেন আপনার মন্ত্রিসভার এই সদস্য। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার পরও তিনি একাধারে সড়ক-পরিবহন, গার্মেন্টস সেক্টর, মুক্তিযোযোদ্ধাদের বিষয়সহ অনেক খাতকেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার নজির রেখেছেন। পরিবহন খাতকে নিজের কব্জায় নিয়ে ইচ্ছে মতো পরিচালনা করছেন তিনি।

সরকারের বাইরে আলাদা একটা স্বাধীন রাজ্য তিনি গড়ে তুলেছেন পরিবহন শ্রমিকদেরকে ব্যবহার করে। রাজদণ্ড বড় কঠিন দণ্ড। এ কথা আমরা জানি। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে ছোট-খাটো অনেক বিষয়ের সঙ্গে আপোস করতে হয়। কিন্তু নৌ-পরিবহনমন্ত্রী টানা দশ বছর ধরে যা করে চলেছেন তা কোনো ছোট-খাটো বিষয় নয়। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরি সভাপতি হয়ে দিনের পর দিন নিজের পেশিশক্তির ব্যবহার যেমন করছেন, একইভাবে পুরো দেশটাকেই যেন অচল করে দিচ্ছেন।

এ কথা এখন মানুষের মুখে মুখে যে, বিরোধী দলকে শায়েস্তায় শ্রমিকদের ব্যবহার করতে শাজাহান খানের নাকি জুড়ি মেলা ভার। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের দিন শাজাহান খানের নির্দেশেই সারাদেশে অঘোষিত হরতাল পালিত হয়, যাতে ওইসব সমাবেশে বেশি লোকসমাগম না হয়। এ কথা সত্য হলে বলবো বিরোধী দলকে না হয় শায়েস্তা করা গেলো, কিন্তু তুচ্ছ সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাখো-কোটি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করায় তাদের সেন্টিমেন্ট কোন্ দিকে যাচ্ছে, তা কি বিবেচনায় আনা হবে না?

প্রশিক্ষিত চালক নিয়োগের কথা বলা হলে শুরু হয়ে যায় ধর্মঘট, রুট পারমিট না থাকা কিংবা ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলসহ বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের বিরুদ্ধে চলে ধর্মঘট, তেল-গ্যাসের দাম বাড়লেই দফায় দফায় অযৌক্তিক হারে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘট, মালিক সমিতি বা শ্রমিক ইউনিয়নের কোনো নেতাকে ব্যক্তি পর্যায়ে ফৌজদারি অপরাধের কারণে পুলিশ আটক করলেও বন্ধ হয়ে যায় পরিবহন চলাচল, সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণাতেও চলে নৈরাজ্য, আদালতের মাধ্যমে খুনি চালককে শাস্তি দেওয়া হলেও দেশব্যপী চলে নৈরাজ্য; যার সব কিছুতেই জিম্মি সাধারণ মানুষ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে, এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। অদক্ষ চালকদের দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, রুট পারমিট না থাকা লক্কর ঝক্কর বাস-ট্রাক রাজপথে নামানো, যেখানে সেখানে যাত্রী উঠানো-নামানো, বাস-গাড়ি চালানোর সময় চালকদের মাঝে অহেতুক রেষারেষি-পাল্লাপাল্লি ইত্যাদি কারণগুলো যে প্রাণঘাতি দুর্ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী তা অনেক গবেষণাতে চিহ্নিত হয়েছে একাধিকবার।

ট্রাফিক আইন না মেনে পথচারীদের রাস্তা পারাপারও অন্যতম একটা কারণ অবশ্যই। কিন্তু অত্যন্ত কষ্ট এবং দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে- মূলত পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানাকেই আপনি দায়ী করছেন বিভিন্ন সময়। আমরা জানি না যে, সব ধরনের দুর্ঘটনার খবরের পত্রিকার কাটিং আপনার সামনে দেওয়া হয় কিনা। দেওয়া হলে অন্তত আপনার মতো একজন অভিজ্ঞ শাসকের মুখ থেকে কেবল পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার কথা নয়। মুখোমুখি দুই গাড়ির সংঘর্ষে নিশ্চয় পথচারীদের কোনো দায় নেই। অথচ এ ধরণের দুর্ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

তিন বছর ধরে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সড়ক নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বনিম্ন দশ বছরের কারাদন্ডের দাবি করা হয়েছিলো বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে। উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনাও ছিলো কমপক্ষে সাত বছর বা তার বেশি সাজার। তাদের দাবি ও আদালতের নির্দেশনা এড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।

চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি ও হেলপারদের পঞ্চম শ্রেণি পাস করার কথা আইনে বলা হলেও তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে অভিজ্ঞ মহলের। কারণ যারা হেলপার হিসেবে কাজ করে তাদের লক্ষ্য থাকে চালক হওয়া। তাহলে তারা পঞ্চম শ্রেণি পাস করে কীভাবে চালক হবে? আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উহ্য রাখা হয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে একটি কমিটি করা হবে যেখানে চালক, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি থাকবে। কিন্তু এই কমিটিতে নিরাপদ সড়ক নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের রাখার দাবি উঠলেও তা অগ্রাহ্য থেকেছে।

অথচ তুলনামূলকভাবে শ্রমিকদের পক্ষে থাকা সেই আইনের বিরুদ্ধেই এখন পরিবহন ধর্মঘটের নামে পুরো দেশকে অচল করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে শাজাহান খানের সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। অবৈধ এই শক্তির উৎসমূল কোথায়, তা বুঝতে কারোর কষ্ট হওয়ার কথা নয়। অপ্রতিরোধ্য শাজাহান খানকে সামাল দেওয়ার শক্তি একমাত্র আপনারই রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ