প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঐক্যফ্রন্টে ‘উজ্জীবিত’ বিএনপি

প্রিয় সংবাদ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর বিএনপির মনোবল চাঙ্গা হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও বিশ্লেষকরা।

বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি সবাইকে পাশে পাওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে। কোন দল বড়, কোনটা ছোট; কে ডানপন্থি, কে বামপন্থি, তা বিবেচনায় না রেখে সরকারবিরোধী সমমনা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে দলটি। পিছপা হচ্ছে না ছুটে যেতে বিদেশিদের কাছেও। প্রায় নিয়মিত ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। যোগাযোগ স্থাপনে কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা থেকে বিশ্বাসী লোক মারফত চিঠির আদান-প্রদানও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছেন দলটির নেতারা। শিগগিরই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইউরোপে যেতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হবে।

দলটির নেতারা জানান, উল্লিখিত বিভিন্ন তৎপরতার পাশাপাশি ড. কামাল, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব কিংবা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো নেতাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন দলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে সাড়ে ৮ মাসের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী। দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও রাজনৈতিক আশ্রয়ে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত। তারপরও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং ২০১৫ সালের লাগাতার আন্দোলনে বিএনপির যে সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয় হয়েছিল এবং ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখন বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেও নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি বাস্তবায়নে সাফল্যের বিষয়ে কম-বেশি সবাই আশাবাদী।

দলটির নীতি নির্ধারণী ফোরাম মনে করছে, রাজনীতিতে সময়ের হাওয়া এখন তাদের দিকেই বইছে।

বিএনপির তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ার আগেও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা খুবই হতাশ ছিলেন। এখন সেই নেতারাই নিজেদের সাফল্যের বিষয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। তারা মনে করছেন, বিএনপি এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে সরকারই এখন দোটানায়। আর বিএনপি মনে করছে, ক্ষমতাসীনরা যতই কথার বুলি ছড়িয়ে বেড়াক, আওয়ামী লীগের পতন সময়ের ব্যাপার। কাজেই নিজেরা (বিএনপি) ক্ষমতায় আসতে না পারলেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হবে না; জনগণও আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না।’

বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার ভাষ্য, রাজপথ আন্দোলনে দুই দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি এবার অনেকটাই ঠান্ডা মাথায় অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে গত এক-দেড় বছরে দলটির পক্ষ থেকে নেওয়া কোনো পদক্ষেপে বা কৌশলে খুব একটা ভুলও হয়নি। বড় প্রমাণ দলের সর্বোচ্চ নেতা খালেদা জিয়া মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দী হলেও কোনো রকমের সহিংসতার পক্ষে যায়নি বিএনপি; বরং খালেদা জিয়ার সাময়িক অনুপস্থিতিতে দলটির নীতি নির্ধারকরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এই মর্মে যে, সরকারের কোনো ‘উসকানিতে’ পা দেবেন না তারা। কারণ তাদের ভাবনায় নিয়মতান্ত্রিক পথেই বর্তমান সরকারের পতন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও এখন সবাই বুঝতে পারছেন, একটা সাফল্যজনক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আর এটাকে নিয়েই সরকারের বড় চিন্তা। জামায়াত নয়, সরকারের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাই ক্ষমতাসীনরা এটাকে কীভাবে ঠেকানো যায়, সেই অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে উসকানি দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পুরো নেতৃত্বই ড. কামাল হোসেনের ওপর অর্পিত। তবে এর মানে কিন্তু এটা নয় যে, বিএনপি নীরব হয়ে গেছে; বরং বিএনপি দাবি আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথ দখলে নিতে এককভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েকটি ছক বা পরিকল্পনা এঁটে এগোচ্ছে দলটি। একটি ব্যর্থ হলে যাতে সঙ্গে সঙ্গে অন্যটি ব্যবহার করা যায়, সে জন্যই ধাপে ধাপে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি নিজেরা হুট করে যেন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে পারে, সেই পরিকল্পনার প্রস্তুতিও সেরে নেওয়া হচ্ছে। কোনো কারণে ঐক্যফ্রন্ট ব্যর্থ হলে যাতে নিজেরা (বিএনপি) একাই মাঠ দখলে নিতে পারেন, সেই প্রস্তুতি নিতেও তৃণমূল নেতাকর্মীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

রিজভী আরও জানান, দাবি আদায়ে তিনটি ভাগে কার্যক্রম পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। একটি অংশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে, একটি অংশ নিজ দল ও অঙ্গ সংগঠনের কাজে এবং তৃতীয় অংশ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ নিয়মিতই আছে। নানামুখী কৌশল প্রণয়নে তাদেরও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিদেশি শক্তিগুলো হঠাৎ বৈরী আচরণ করলেও যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়, সেটিও মাথায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এবার বিদেশি প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ভালোই সমঝোতা সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির।’

‘তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক আশ্বাসও পাওয়া গেছে এবং এই আশ্বাস নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকবে বলেও বিশ্বাস করে বিএনপি। ফলে এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার জেল মুক্তির আন্দোলন খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না দলটি; বরং সামনে একটাই টার্গেট, আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘ভারত থেকে আওয়ামী লীগ আর আগের মতো খুব একটা সুবিধা পাচ্ছে না; বরং দেশটি বাংলাদেশের নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার পক্ষে তাদের মতামত দিন দিন স্পষ্ট করছে। আর ড. কামাল হোসেনের সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হারানোর কারণে ভারতও ড. কামালের নেতৃত্বে নতুন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নেপথ্যে থেকে সমর্থন দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি তো একেবারেই স্পষ্টতর। এমনকি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সংগঠিত করার পক্ষে তারাও যেন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে।’

তিনি বলেন, ‘এত এত মেগা প্রকল্পের পরও চীন এ মুহূর্তে অনেকটা নিরপেক্ষ ভূমিকায় রয়েছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হলেও তাদেরকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাশিয়ার খুব একটা সহযোগিতার সুযোগও নেই। এমনকি আওয়ামী লীগ যে ধরনের সমর্থন চাচ্ছে, তা কোনো দেশই এখন আর দিতে চাচ্ছে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আওয়ামী লীগকে বড় টেনশনে ফেলে দিয়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, এমন ঐক্য গঠন সম্ভব হবে না। এরপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কৌশল ও নানা তৎপরতা ছিল। কিন্তু কোনো কৌশলই শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। কারণ এর পেছন একটি বড় শক্তি কাজ করছে, যেটি আওয়ামী লীগও শেষ পর্যায়ে এসে বুঝতে পেরেছে।’

‘তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে নমনীয় নীতি প্রদর্শন করে সরকার এ মুহূর্তে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিএনপিকে সভা-সমাবেশের অনুমতি না দিলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ঠিকই সভা-সমাবেশের অনুমতি দিতে অনেকটাই বাধ্য হচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিতে রাজি নয়।’

২৭ অক্টোবর, শনিবার চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কার্যালয় নসিমন ভবনের সামনে নূর আহম্মদ সড়কে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি অবশ্যই দিতে হবে। তাকে বন্দী করে রাখার প্রতি ঘণ্টার হিসাব নেওয়া হবে।’

সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. কামাল বলেন, ‘৭ দফায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। এই প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করলে তার কী শাস্তি হবে, তা আপনারা (সরকার) চিন্তাও করতে পারবেন না।’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে আনার পর এখানে তার পছন্দের চিকিৎসকদের অধীনে তিনি আছেন। অন্যান্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও হাসপাতালে তিনি (খালেদা জিয়া) পাচ্ছেন। এটিকেও বিএনপি নেতারা তাদের একটি বিজয় হিসেবে দেখছেন।

বিএনপি সংশ্লিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বিদেশি শক্তি রয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশও আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে ড. কামালের নেতৃত্বকে সমর্থন দিচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যদিও এখনো ভারতের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ওই সূত্রের ভাষ্য, বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাটের গাড়িবহরে হামলার পর দৃশ্যপট অনেকটা পাল্টে গেছে। একই রাতে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় হামলার পর সুশীল সমাজও প্রকাশ্যেই জাতীয় ঐক্যের পক্ষ নিয়েছেন, যা পরোক্ষভাবে বিএনপির পক্ষে গেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ