প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংকটের গভীরতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

ড. তারেক শামসুর রেহমান : আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের একজন ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়ে দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার একটিও মানা হবে না। গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার উত্তরায় মেট্রোরেল প্রকল্প পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা জানান। এদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সিলেটে প্রথম জনসভা করে আবারও দাবি জানিয়েছেন সাত দফা বাস্তবায়নের। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি আর সরকারের অনড় অবস্থান সংকটের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দরকার আস্থার সম্পর্ক। সেই আস্থার সম্পর্ক অনেকদিন আগে থেকেই নেই। চলতি সপ্তাহেই একাদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হবে। ৩০ অক্টোবর থেকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে ভোট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতেই হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বছর ২৯ জানুয়ারি সংসদের অধিবেশন বসে ছিল। এই হিসেবে ২৮ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হবে। এবার তফসিল ঘোষণার পর কমপক্ষে ৪৫ দিন হাতে রেখে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণের কাজ চলছে। ৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।

সেক্ষেত্রে ১৮-২০ ডিসেম্বর সম্ভাব্য একটি তারিখ রাখা হয়েছে। ফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কর্তৃক উত্থাপিত সাত দফা সরকারের পক্ষে যে মানা সম্ভব নয়, এটাই স্বাভাবিক। ওবায়দুল কাদের সে কথাটাই বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সরকার সাত দফা না মানলে ঐক্যফ্রন্ট কী করবে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি ভারতের পক্ষ থেকে ‘সকল দলের অংশগ্রহণে’ একটি নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, তার কী হবে? এতে করে সংকটের গভীরতা বাড়বে! সৃষ্টি হবে নানা জটিলতা। একটি ‘সংলাপ’ এর সমাধান হতে পারতো। কিন্তু তাও নাকচ করে দিয়েছে সরকার। তাহলে রাজনীতি এখন কোন পথে?

এটা ঠিক সাত দফায় বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। এই সাত দফা মূলত অনেকগুলো দফার একটি সংমিশ্রণ। যেমন বলা হচ্ছে সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও বেগম জিয়ার মুক্তি। এগুলো সব ১নং দফায় রয়েছে। এইসব দাবি-দাওয়া নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকার যদি পদত্যাগ করে, তাহলে ক্ষমতায় এখন থাকবে কে? কার হাতে সরকার ক্ষমতা দিবে? নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার তো এখন সংবিধানে নেই। তাহলে? ২নং দফায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এতো অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা কী সম্ভব? তবে এটা ঠিক, সাত দফার মধ্যে কয়েকটি দফা রয়েছে (সকল রাজনৈতিক মামলা স্থগিত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, সেনা মোতায়েন, সকল দলের সমাবেশের অনুমতি ইত্যাদি) যা সরকার মেনে নিয়ে আন্তরিকতা দেখাতে পারে। এতে ক্ষতির কিছু নেই। বরং আস্থার সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। আমরা এই আস্থার সম্পর্কটিই চাই।

আস্থার সম্পর্ক না থাকলে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উচিত ছিল দফাগুলো এমনভাবে তৈরি করা, যা সংবিধান সম্মত হয় এবং সরকার তা মেনে নেয়। সরকার তো একটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। সুতরাং সরকার এখন দাবি কেনো মানবে? ২০১৪ আর ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ন ভিন্ন।

২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করেছিল। তাতে লাভ হয়নি। সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হয়েছে, যদিও ১৫৩ জন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ অব্দি নির্বাচনে যাবে। আর যদি না যায়, তাহলে আরও অনেক দল রয়েছে, যারা নির্বাচনে যাবে। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির একটি ‘বড় ভূমিকা’ আমরা লক্ষ্য করবো। জাতীয় পার্টি সত্যিকার অর্থেই সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে, যদি ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে না যায়! তবে বাস্তবতা হচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট চূড়ান্তমুহূর্তে নির্বাচনে যাবে।

নির্বাচনের আগে আমরা ‘কম’ বিতর্ক চাই। চাই একটা আস্থার সম্পর্ক। নেতা-নেতৃরা যত কম ‘কথা’ বলবেন, বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে চলবেন, অতীতমুখিতা পরিহার করবেন ততই আমাদের মঙ্গল।

লেখক : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ