প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বৈধভাবে দেশে কাজ করছেন প্রায় ৮৬ হাজার বিদেশি

বাংলা ট্রিবিউন : বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে কর্মরত আছেন ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি। তারা ৩৩ ধরনের প্রতিষ্ঠানে ১৬ ক্যাটাগরিতে কাজ করছেন। বিশ্বের ৪৪টি দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন এসব নাগরিক। এই বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতের আর সবচেয়ে কম উজবেকিস্তানের। ভারতের ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন এবং উজবেকিস্তানের ১৬৫ জন নাগরিক এদেশে কর্মরত আছেন। এসব বিদেশি কর্মীর বেশিরভাগই ঢাকায় বসবাস করেন। এর বাইরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ-এসবি’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধভাবে বসবাস করছেন ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৭৯ জন বিদেশি নাগরিক। আর তারা কর্মরত আছেন এমন এক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের প্রকৃত সংখ্যা কতো সে বিষয়ে সরকারের কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও এনজিও ব্যুরোর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর কোনটির কাছেই বিদেশিদের সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। এক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্যটির তথ্যেও মিল নেই।

গবেষকরা বলছেন, বিদেশিরা কেন, কী কাজে বাংলাদেশে এসেছেন, কতদিন থাকবেন সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলোর তথ্য সমন্বয় জরুরি। এনবিআর’র কাছে বিদেশি উদ্যোক্তা নিয়ে তথ্য থাকলেও বিদেশি কর্মীদের বিষয়ে কোনও তথ্য নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-বিআইডিএস’র গবেষণা পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বিদেশিরা ইমিগ্রেশন দিয়ে যখন প্রবেশ করছে তখনই কে কোন ব্যপারে এসেছেন তা নির্ধারণ হওয়া জরুরি। মোট সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ না। তবে কতজন কোন কাজে এসেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মাথা ব্যথা তাদের নিয়ে যারা বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন। ছাত্র, উদ্যোক্তা, চিকিৎসা বা পর্যটনের জন্য যারা আসছেন তাদের ব্যাপারে কিছু বলার নেই। কারণ, তাদের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, দেশে এমনিতেই বেকারের সংখ্যা অনেক। এ অবস্থায় বিদেশিরা এসে কেন কাজ করছে সেটা চিন্তার ব্যপার। বিদেশি যারা বেতনভুক্ত কর্মী এবং যাদের বিকল্প বাংলাদেশে আছে তাদের নিয়েই মূলত চিন্তা।

তিনি বলেন, গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে দেখা যায়, এইচআর (হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট) এর একটা বড় অংশ বিদেশি। অথচ বাংলাদেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো যা পড়ায় তার শতকরা ৯০ ভাগই ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-বিবিএ আর মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এমবিএ। টেক্সটাইল, ডাইংসহ যেগুলো আমাদের উৎপাদনের প্রধান খাত সেসব জায়গায় প্রচুর বিদেশি কাজ করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতেও প্রচুর বিদেশি কাজ করছে। আমাদের স্থানীয় চাকরির বাজারকে আশংকায় ফেলে বিদেশিরা কোথায় কাজ করে, কেন করে, কতজন করে তার উপর গবেষণা জরুরি বলে মনে করেন ড. নাজনীন আহমেদ।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও এনজিও ব্যুরো-এই তিন সরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীদের কাজ করার অনুমতি দেয়। পোশাক, বস্ত্র, চামড়াসহ বেসরকারি শিল্প খাতের জন্য বিডা, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বেপজা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় বিদেশিদের কাজ করার অনুমতি দেয় এনজিও ব্যুরো। তথ্য বলছে, ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করছে প্রায় ১৭ হাজার বিদেশি কর্মী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর’র তথ্য অনুযায়ী, ১৫ হাজার বিদেশি নাগরিকের তথ্য থাকলেও আয়কর দেন এমন বিদেশির সংখ্যা ১৪ হাজার।

সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে অমিল

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, তুরস্ক, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪৪টি দেশের নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত আছেন। এই সংখ্যা ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন। সংখ্যার দিক থেকে ভারতের নাগরিকরাই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। দেশটির ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন কর্মী বাংলাদেশে কর্মরত আছেন। এর পরেই চীনের স্থান। দেশটির ১৩ হাজার ২৬৮ জন নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত আছেন। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ৪ হাজার ৯৩ জন, দক্ষিণ কোরিয়ার ৩ হাজার ৩৯৫ জন, মালয়েশিয়ার ৩ হাজার ৮০ জন, শ্রীলংকার ৩ হাজার ৭৭ জন, থাইল্যান্ডের ২ হাজার ২৮৪ জন, যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৮০৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৪৪৮ জন, জার্মানির ১ হাজার ৪৪৭ জন, সিঙ্গাপুরের ১ হাজার ৩২০ জন, তুরস্কের ১ হাজার ১৩৪ জন বাংলাদেশে কর্মরত আছেন।

অন্যদিকে, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকের কথা ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৭৯ জন। তবে এদের মধ্যে কে কোথায় কিভাবে বসবাস করছেন, কর্মরত আছেন তার সব তথ্য এসবি’র কাছে নেই। এসবি’র এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের অনেকে মাদক চোরাচালান, জাল মুদ্রা ব্যবসা, এটিএম কার্ড জালিয়াতি, মানবপাচার ও হুন্ডির সঙ্গে জড়িত রয়েছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশিদের অনেকে বাংলাদেশি জাল পাসপোর্ট ও জাল ন্যাশনাল আইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) ব্যবহার করছে। অনেকে আবার ভোটার তালিকাতেও নাম তুলেছেন।

অন্য একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে কর্মরত আছেন প্রায় ১০ লাখ বিদেশি। আর অবৈধ বিদেশি কর্মীদের বড় অংশই পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসে কাজ করছেন। নিবন্ধিত না হয়েই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তারা। অন অ্যারাইভাল ভিসা নিয়েও এসেছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশে প্রবেশের পর ঠিকানা পরিবর্তন করায় পরে খোঁজ করে আর পাওয়া যায় না তাদের। যারা পর্যটক ভিসায় এসে কাজ করেন তাদের বড় অংশই তিন বা ছয় মাস পর নিজ দেশে ফিরে গিয়ে পুনরায় ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হন। অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের বেশিরভাগই ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপের বাসিন্দা।

যে ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন বিদেশিরা

পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান গার্মেন্ট, কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল, ওভেন ও নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, বায়িং হাউস, মার্চেন্ডাইজিং কোম্পানি, ফ্যাশন হাউস, এনজিও, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, লজিস্টিকস, বহুজাতিক কোম্পানি, বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, মুঠোফোন কোম্পানি, পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, মৎস খামার, হ্যাচারি, চামড়াজাত প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি, মিডিয়া রিসার্চ প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, প্রসাধনী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, আসবাবপত্র তৈরির কারখানা ও দোকান এবং নির্মাণ খাতসহ ৩৩ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন বিদেশি কর্মীরা। বিশেষজ্ঞ, কান্ট্রি ম্যানেজার, কনসালট্যান্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, মার্চেন্ডাইজার, টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার, চিকিৎসক, নার্স, ম্যানেজার, প্রকৌশলী, প্রোডাকশন ম্যানেজার, ডিরেক্টর, কুক, ফ্যাশন ডিজাইনার ও শিক্ষকসহ ১৬ ধরনের পদ-পদবি নিয়ে কাজ করছেন তারা।

ভিসা আছে, কিন্তু ওয়ার্ক পারমিট নেই

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট-রামরু’র পরিচালক সি আর আবরার বলেন, বিদেশি কর্মীদের অনেকের হয়তো ভিসা আছে কিন্তু ওয়ার্ক পারমিট নেই। কাজেই কাজ করার অনুমতি নাই তাদের এখানে। প্রথমত এটার একটা সংখ্যা নিরুপন করা জরুরি। কোন সেক্টরে কারা, কিভাবে কাজ করছেন তা জানা দরকার। বাংলাদেশের শ্রমিক যারা বিভিন্ন দেশে আছেন তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। আমাদের দেশে যদি ওই ধরনের শ্রমিক থেকে থাকেন তাহলে সেই তথ্যটা জানা কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।

শেষ হয়নি এনবিআর গঠিত টাস্কফোর্সের কাজ

বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করতে ২০১৬ সালে এনবিআর’র উদ্যোগে গঠিত হয়েছে টাস্কফোর্স। তবে টাস্কফোর্স কাজ এখনও শেষ করতে পারেনি। বিডা, এসবি, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর-ডিজিএফআই, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর-এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেপজা, পাসপোর্ট অধিদফতর, এনজিও ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরাও এর সঙ্গে যুক্ত আছেন।