প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস —

বিভুরঞ্জন সরকার : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির এক দফাও মানা হবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, ‘যদি আমাদের দাবি না মেনে তফসিল ঘোষণা করেন তাহলে বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে’। মওদুদের ঝড় ওঠার হুঁশিয়ারি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তেমন কোনো চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সরকার ঐক্যফ্রন্টের দাবি মানবে না। এই দাবিগুলো নতুন নয়। আগে থেকেই এসব দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি।

বোতল নতুন, মদ পুরাতন। সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সংবিধানসম্মত নয়। অসাংবিধানিক দাবি পূরণে সরকার যে কোনো চাপের কাছে নত হবে না – প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা সেটা অনেকবার বলেছেন। তারপরও বিএনপি মনে করছে, বারবার আন্দোলনের কথা বলে একসময় গিয়ে মানুষকে আন্দোলনমুখী করা যাবে। কিন্তু বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার জন্য দেশের মানুষ আন্দোলন করবে, আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দেবে – এই ধারণা তাদের কেন হয়েছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যদি একটু কমেও থাকে, তাহলেও এটা কি করে বলা যায় যে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে? বিএনপির রাজনৈতিক ক্যালকুলেশন ভুল বলেই আজ তাদের ছোট ছোট দলের খবরদারি মেনে নিয়ে ঐক্যফ্রন্টে সামিল হতে হয়েছে। আন্দোলন করে দাবি আদায়ের শক্তি বিএনপি ও তার সহযোগীদের নেই। তারপরও গরম গরম কথা বলে মানুষকে উজ্জীবিত করার তালে আছে বিএনপি। নির্বাচনের তফসিল একতরফাভাবে ঘোষণা হলেই ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলনে যাবে – এটা তাদের ভাবনা বা পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা হুবহু বাস্তবায়নের সুযোগ ও সম্ভাবনা তাদের আছে কি?

ঐক্যফ্রন্টের মূল শক্তি বিএনপি। বিএনপির পেছনে আছে জামায়াত। বিএনপি কখনই আন্দোলনের দল নয়। বিএনপি আন্দোলন করে কোনোদিন কোনো দাবি আদায় করতে পারেনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ছিল বলে বিএনপির সাফল্য দৃশ্যমান হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে তিনবার। এই তিনবার বহু আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে, বহু দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছে বিএনপি । কিন্তু কোনো দাবি আদায় করতে পারেনি। আন্দোলনে কোনো সাফল্য নেই। খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়াও ঠেকাতে পারেনি দলটি।

বাংলাদেশে আন্দোলনের দল আওয়ামী লীগ। এই দল আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়নি। আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে লোক হাসানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না আওয়ামী লীগবিরোধীরা। আন্দোলনের হাকডাক বন্ধ করে বিএনপি যদি গণতান্ত্রিক ধারায় অগ্রসর হতো, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো তাহলে দেশের জন্য ভালো হতো, দলের জন্যও ভালো হতো। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিলে তার ফল ভালো হয় না। বিএনপি সব সময় শক্তির ভাষায় কথা বলতে বলতে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারা জোর দেখানোর পথ নিয়েছে বা নেয় বলেই আওয়ামী লীগও সে পথেই হাঁটতে উদ্বুদ্ধ হয়। যারা আওয়ামী লীগের কাছে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করেন তারাই আবার বিএনপির যেকোনো অশুদ্ধ আচরণে নীরবতা পালন করেন।

বিএনপি ঘোষণা দিয়ে সরকার ফেলে দিতে চাইবে আর সরকার চেয়ে চেয়ে নিজেদের পতন প্রত্যক্ষ করবে, তাই কখনও হয়? কোনো দেশে তা হয়? বিএনপি অতীতে নিজেদের নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো রাজনৈতিক নৃশংসতা-বর্বরতা বিএনপি সরকারে থাকতে দেশে সংঘটিত হয়েছে এবং সরকার অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি না করে নানা গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়েছে। এখন সরকার যে বিএনপির গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করছে তা তাদের অতিকথনের কারণেই ঘটছে বলে মনে হয়। বিএনপি নেতা মওদুদ বলেছেন, সাত দফা দাবি না মানলে ঝড় উঠবে! এখন সরকার তো ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি রোধে আগাম ব্যবস্থা নেবেই। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তো সরকারেরই। সরকারের কাছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে উদারতা আশা করলে বিএনপিকেও উদারতা দেখাতে হবে। এক পক্ষ অনুদার হলে অন্য পক্ষ স্বাভাবিকভাবেই কঠোরতা দেখাবে।

দেশের মানুষের কোন আচরণ দেখে মওদুদ আহমেদ ঝড়ের পূর্বাভাস দিলেন? এ কথা ঠিক, মানুষ নির্বাচন চায়। নিজের ভোট নিজে দিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে চায়। মানুষ এটাও জানে, ‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ’। তাই নির্বাচনের জন্য কোনো ঝড়-ঝঞ্ঝার কবলে পড়তে চায় না।

ব্যারিস্টার মওদুদের মুখে ঝড়ের কথা শুনে পুরনো একটি জনপ্রিয় বাংলা গানের কথা মনে পড়লো :
‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, আজকে হলো সাথী , সাত মহলার স্বপ্নপুরী, নিভলো হাজার ভাতি। রুদ্রবীণার ঝংকারেতে,  ক্ষুব্ধ জীবন উঠলো মেতে, সকল আশার রঙিন নেশা ঘুচলো রাতারাতি।‘

সাত দফা আদায়ের জন্য আন্দোলনের ঝড় তুলতে গিয়ে ক্ষমতার রঙিন নেশা রাতারাতি ঘুচে না গেলেই ভালো!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ