প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পূর্বাচলের গরম মিষ্টি এবং রাজনীতির নরম পাক

বিভুরঞ্জন সরকার : পূর্বাচল নামের যে উপশহরটি গড়ে উঠছে সেটা নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় পড়েছে। তিনশ ফুট চওড়া একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে বলে মানুষের মুখে মুখে জায়গার নামই হয়েছে তিনশ ফুট। বালু নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজ পেরিয়ে নরসিংদীর দিকে একটু এগিয়ে গেলে হাতের ডানে একটি ছোট্ট বাজার। আগে নাম ছিল ভোলানাথপুর। এখন ভোলানাথপুর চাপা পড়েছে পূর্বাচল নতুন শহরের নিচে। এখন জায়গাটি অনেকের কাছেই মিষ্টির মার্কেট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দামে সস্তা, গরম গরম মিষ্টি। মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রঙের বাহারী সব লোভনীয় মিষ্টির ছবি। প্রতিদিনই এখন গ্রাহক-দর্শনার্থী বাড়ছে তিনশ ফুটের মিষ্টির বাজারে। শুধু মিষ্টি নয় নীলা মার্কেটে আরো নানা পণ্য সামগ্রীর দোকান আছে। পাওয়া যাচ্ছে নানা রকম টাটকা সবজি। গরুর খাঁটি দুধ। মানুষ আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে পেরে খুশি। একটি রেস্টুরেন্ট আছে, একবারে গ্রামীণ পরিবেশে খোলমেলা, বসে আড্ডা যেমন দেওয়া যায়, তেমনি ভোজনরসিকরা পেতে পারেন উপাদেয় খাবার। রেস্টুরেন্টটার নামও মজার চাপ চাবাই। গরম লুচির সঙ্গে গরু-খাসি-মুরগির নানা সুস্বাদু পদ।

তবে মিষ্টির খাদক এবং খদ্দেরই বেশি বলে মনে হলো। নানা বয়সের নারী-পুরুষ মিষ্টি খাওয়ার জন্য ভিড় করছেন। মোট ১২টি মিষ্টির দোকান। আমরা গিয়েছি বিকাল সাড়ে চারটার দিকে। কোনো দোকানই খদ্দেরশূন্য নেই। বড় বড় কড়াইতে থরে থরে সাজানো রসালো মিষ্টি দেখে কার না জিভে জল আসবে! ডায়াবেটিসের রোগীও বুঝি গরম রসগোল্লার স্বাদ পরখ করতে ভুল করবেন না। কত সাইজের কত রকম মিষ্টি। সাদা আছে। আছে রঙিন। আছে বিশাল সাইজের চমচমের মতো মিষ্টি, যার নাম দেওয়া হয়েছে বালিশ। একটি মিষ্টির ওজন দুই কেজি।

মিষ্টির দামও আকর্ষণীয়। কেজি মাত্র দেড়শ টাকা। একটু বেশি দামের মিষ্টিও আছে। তবে সেটাও দুশ টাকার নিচে। যেকোনো মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মিষ্টি না খেয়ে এবং না কিনে উপায় থাকে না। কারণ ‘টেস্ট’ করার জন্য যে মিষ্টিটা আপনার হাতে তুলে দেওয়া হবে তার কোনো দাম নেওয়া হবে না। ফ্রি। একটা কিনলে একটা ফ্রি নয়। ফ্রি মিষ্টি খেয়ে আপনি না কিনলেও কোনো জোরজবরদস্তি নেই। তবে বিনে পয়সায় স্বাদ নিয়ে কেউ কি আর না কিনে পারে? ফলে ১২টি দোকানেই হরদম বিক্রি হচ্ছে। দুচার কেজি যেমন কিনছেন, তেমন ২০/৩০ কেজি কেনার গ্রাহকও পাওয়া গেল।

প্রশ্ন হলো, এতো কম দামে ওখানে মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে কীভাবে? জানা গেল দুধ আসছে পাবনা এবং কুষ্টিয়া থেকে। প্রতি কেজি দুধের দাম ৬০ টাকা। ৫ কেজি দুধে হয় এক কেজি ছানা। অর্থাৎ এক কেজি ছানার দাম তিনশ টাকা। অথচ এক কেজি মিষ্টির দাম দেড়শ টাকা। তাহলে প্রতি কেজি ছানায় মিষ্টি তৈরি হচ্ছে কয় কেজি? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন ‘কারিগর’ যিনি আছেন কারখানায় এবং কাখানায় যাওয়ার সুযোগ আমার হয়নি।

মিষ্টির গুণমান নিয়ে প্রশ্ন করাই যেতে পারে। কেউ বলতে পারেন ওগুলো ছানার মিষ্টি নয়, ময়দার দলা। যে যাই বলুন, মুখে দিলে কিন্তু ময়দার দলা মনে হচ্ছে না।

পূর্বাচলের ওই মিষ্টির সঙ্গে দেশের রাজনীতির কোনো মিল কি কেউ খুঁজে পান? মিষ্টির দাম রহস্যজনকভাবে কম। কিন্তু ওটা নিয়ে কি গ্রাহকরা কেউ মাথা ঘামাচ্ছেন। আমি কম দামে পাচ্ছি এবং মিষ্টির স্বাদে কোনো হেরফের নেই। ঢাকার নামিদামি খানদানি মিষ্টির দোকানের বেশি দামের মিষ্টির সঙ্গে দেড়শ টাকা দামের মিষ্টির তফাৎ বের করা যেমন কঠিন তেমনি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত তফাৎ বের করাও এখন কঠিন। রাজনীতিতে চলছে ভাঙাগড়া ও রঙ বদলের খেলা। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করাই লক্ষ্য। কার সঙ্গে যে কে গিয়ে জোট বাধছে। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক দাবি করে উঠছেন জিয়ার মঞ্চে। এটা যদি হজম করা যায় তাহলে কম দামের মিষ্টিও বদহজম হবে না। মিষ্টিতে ছানা বেশি না ময়দা বেশি তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের জন্য সাশ্রয়ী এবং স্বাস্থ্য সম্মত কিনা। রাজনীতিটাও মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হলেই ভালো। কে কোন সাইনবোর্ডের আড়ালে যাচ্ছেন তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জনকল্যাণের রাজনীতি, না, ক্ষমতার ‘বালিশ’ মিষ্টি খাওয়ার প্রতিযোগিতা – সেটা অন্তত মানুষের কাছে পরিষ্কার করা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত