প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৬৫০ বিধবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

দৈনিক আমাদের সময় : পরিবারে সর্বগ্রাসী অভাব। সেই ভূতের হাত থেকে রক্ষা পেতে অষ্টম শ্রেণির গ-ি পেরোনোর আগেই সংসারের গ-িতে বাধা পড়েন কিশোরী মুক্তা বেগম। ভূতের গ্রাস থেকে মুক্তিও পান মুক্তা বেগম। স্বামী বদিয়ার রহমান ভূমি অফিসের টাইপিস্ট। জমির মালিকানা বদল হলেই তার বাড়তি আয়। এর মধ্যে সংসারে আসে নতুন অতিথি। দেখতে দেখতেই সেই অতিথি বড় হয়, তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। আসে আরেক অতিথি। হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে দুই কন্যাসহ বদিয়ার-মুক্তার সুখময় দাম্পত্যযাত্রায়, মারা যান স্বামী। ফের দারিদ্র্যের কশাঘাত; বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন মুক্তা। ফিরে আসেন বাবার পরিবারে। খেয়ে না-খেয়ে চলে মা-মেয়ে তিনজনের সংসার। সময় গড়ায়। যে অভাবের কারণে অল্পবয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন মুক্তা, তার বড় মেয়েটিকেও সে কারণেই একই পথে তুলে দেন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী ভাদাই ইউনিয়নের বিন্নাগাড়ী গ্রামের মুক্তা বেগমের জীবনের গল্প এটি। ইউনিয়ন পরিষদে তিনি বিধবার তালিকাভুক্ত হলেও ভাতা নেই। ২০১৫ সালের কথা। একদিন ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের ‘আলো’ প্রকল্পে ডাক পড়ে মুক্তার। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন করে স্বাবলম্বী হতে ১৮ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য সহায়তা ভাতা পান তিনি ওই প্রকল্প থেকে। আর সপ্তম শ্রেণিতে পড়–য়া ছোট মেয়ে উম্মে হাবিবা বর্ষা পায় মাসে ৫শ টাকা করে। সহায়তার টাকায় একটি গরু কেনেন মুক্তা। ৪/৫ মাস সেটি মোটাতাজা করে বিক্রি করেন ৩৫ হাজার টাকায়।
এভাবে গাভী, কবুতর ও হাঁস-মুরগি পালন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। সম্বলহীন মুক্তা আজ ২৭ শতক জমি লিজ নিয়ে ধানচাষও করছেন। গোপন ব্যালটে ‘স্বাবলম্বন নারী ফোরাম’-এর সভানেত্রী হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলার ৬৫০টি বিধবা পরিবারকে। জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তার দ্বারে দ্বারে ঘুরে অসহায় নারী ও এতিম শিশুদের অধিকার আদায়ে কাজ করে গত বছর নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক পুরস্কার অর্জন করেন মুক্তা।
উপজেলা সমবায় দপ্তরের তথ্যমতে, এতে সনাতন ধর্মাবলম্বী ৬৭টি পরিবারসহ বর্তমানে ৬৫০টি বিধবা পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের বিধবা ও এতিম শিশুদের
জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, অধিকার নিশ্চিতকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের পলাশী, মহিষখোঁচা, ভাদাই, সাপ্টীবাড়ী ও সারপুকুর এলাকায় চার বছরের প্রকল্প হাতে নেয়।
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবদুুল জলিল বলেন, আমরা প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারলেও নগদ অর্থ সহায়তা দিতে পারি না। কিন্তু সংস্থাটি প্রকল্পের এককালীন অর্থ সহায়তার পাশাপাশি নারীদের সংগঠিত করেছে। নারীরা ১৮ হাজার টাকাকে পুঁজি করে আয়ের অর্থ ফোরামে সঞ্চয় করছে। ফোরামে সঞ্চিত অর্থ সদস্যরা আবার সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে নিচ্ছে। এভাবে তারা স্বাবলম্বী। প্রত্যেক নারীর নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। ব্যাংকে পাকা জমা করছে। এতে ২০১৯ সালের এনজিওর প্রকল্প শেষ হলেও এসব নারী পিছিয়ে থাকবেন না, এগিয়ে যাবেন।
এক সময়ে হতাশায় নিমজ্জিত মুক্তা বেগম আমাদের সময়কে বলেন, আমি যে বিধবা, এ কথা ভাবতেই চাই না। আমি চাইছি এলাকায় আমার মতো যে সব নারী পিছিয়ে আছে, তাদের অধিকার কীভাবে আদায় করা যায়। এক সময় আমি বাজার চিনতাম না। এখন স্বাবলম্বন নারী ফোরামের হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি নলকূপ দিয়ে দিচ্ছেন। খুব সহজে সরকারিভাবে বিধবা ভাতা পাচ্ছি। জোটবদ্ধ থাকায় এখন আমাদের দিকে কেউ আড় চোখে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। নিজে বাল্যবিয়ে করলেও ছোট মেয়েটির ভবিষ্যৎ এভাবে গলা টিপে হত্যা করব না- বলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার দেশের এই নারী।
পলাশী ইউনিয়ন রথেরপাড়া গ্রামের ভারতী রানী বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে ক্যানসারে আমার স্বামী (মনোরঞ্জন) মারা যান। তার চিকিৎসা ব্যয় ছাড়াও দুর্ঘটনায় আমার ছেলে আহত হওয়ার পর সামান্য জমিজমা যা ছিল, সেগুলো বন্ধক দিই। এর ফলে একপর্যায়ে ৮ বছরের মেয়ে প্রার্থনা, ছেলে পবিত্র কুমার, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে বড় অসহায় হয়ে পড়ি। কিন্তু এই অর্থ সহায়তা আর ছেলেমেয়ের নামে পাওয়া মাসে ১ হাজার টাকাকে পুঁজি করে আজ আমি বন্ধকী জমি ফেরানোর পাশাপাশি অভাবকে ভুলে গেছি।
আদিতমারীতে যেসব নারী বালবিধবা কিংবা অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, সরেজমিনে দেখা গেছে, তারা ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। নারীর নেতৃত্বেই সচ্ছলতার সঙ্গে ক্ষমতায়ন, পয়ঃনিষ্কাশন, উৎপাদনশীলতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সচেতনতায় দারুণ উন্নতি হয়েছে তুলনামুলক পিছিয়ে পড়া এ এলাকায়। মায়েদের পাশাপাশি এতিম শিশুদের মধ্যে ভবিষ্যৎ জাগানিয়া স্বপ্নের বীজ বুনেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থাটি। এতিমদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শিশু ক্লাব। বাল্যবিবাহ, পড়াশোনা থেকে ঝরে প্রতিরোধ, খেলাধুলা, পরিবেশ সুরক্ষা, শিশুকল্যাণ সচেতনতাসহ স্থানীয় সমস্যা সমাধানে কাজ করছে শিশুরা।
সাপ্টীবাড়ীর কিসমাত চন্দ্রপুর আলো শিশু কাব্লের সদস্য ও গিরিজা সঙ্কর মডেল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র পঙ্কজ চন্দ্র বলেন, সপ্তাহে একদিন এই ক্লাবের অনেক কিছু শিখি। এলাকায় বাল্যবিবাহ হলে থানার ওসিকে ফোন দিই। কারও টয়লেট সমস্যা হলে চেয়ারম্যানকে ফোন দিই।
ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন্সের কো-অর্ডিনেটর সফিউল আযম বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অসহায় ও এতিম শিশু পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক মর্যাদা পুনঃস্থাপন, অধিকার ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে কাজ করে যাচ্ছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ