প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ভুলিয়েছে ভিটা হারানোর দুঃখ

কালের কন্ঠ : যে ভিটাতে জন্ম, যেখানে কয়েক পুরুষের নাড়ি পোঁতা, সেই ভিটা ছেড়ে দিতে হয়েছে। এ নিয়ে মনে দুঃখ ছিল, সংশয় ছিল ভবিষ্যৎ নিয়েও। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের ১৩০টি পরিবারের অনেকেই ভেবেছিল, তারা বুঝি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াল। কিন্তু এখন তাদের সেই দুর্ভাবনা দূর হয়েছে। যে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তারা ভিটা ছেড়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই দিয়েছে নতুন ঠিকানা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ নামের আবাসন প্রকল্পটিতে গড়ে তোলা ১৩০টি বাড়ি আজ হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত বৃহস্পতিবার সকালে ‘স্বপ্নের ঠিকানায়’ গিয়ে বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠ’র। তারা জানায়, বসতবাড়ি ছাড়তে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু এখন পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা হতে পেরে ভালো লাগছে। আগে গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ ছিল না, হাই স্কুল বা কারিগরি স্কুল ছিল না। কিন্তু নতুন আবাসন প্রকল্পে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সন্তানদের শিক্ষাগ্রহণ সহজ হবে।

স্বপ্নের ঠিকানা আবাসন প্রকল্পে ধানখালী ইউনিয়নের মধুপাড়া, চরনিশানবাড়িয়া, দাশের হাওলা, খরাত খা ও মরিচবুনিয়া গ্রামের ১৩০টি পরিবারের জন্য ১৩০টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সেমিপাকা বাড়ি; ৬ শতাংশ জমিসহ যার আয়তন এক হাজার বর্গফুট। আর ৮২টি বাড়ি ৮ শতাংশ জমিসহ এক হাজার ২০০ বর্গফুটের। যারা ২০ শতাংশের চেয়ে বেশি আয়তনের বাড়ি হারিয়েছে তারা পাবে এক হাজার ২০০ বর্গফুটের বাড়ি। আর যারা এর চেয়ে কম আয়তনের বাড়ি হারিয়েছে তারা পাবে এক হাজার বর্গফুটের বাড়ি। প্রধানমন্ত্রী পুনর্বাসিতদের মধ্যে পাঁচ নারী ও পাঁচ পুরুষের হাতে বাড়ির চাবি তুলে দেবেন। বাকি বাড়িগুলোর চাবি প্রকল্পের কর্মকর্তারা আজই হস্তান্তর করবেন।

সরেজমিনে স্বপ্নের ঠিকানা আবাসন প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই চারদিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি বাড়ির গঠনশৈলী একই রকম। দু-তিনটি বাড়ির জন্য বসানো হয়েছে একটি করে নলকূপ। নির্মাণ করা হয়েছে সুদৃশ্য বহুতল মসজিদ। আছে পাড় বাঁধানো বড় আকারের দুটি পুকুর। প্রতিটি বাড়িতেই দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। আছে খেলার মাঠ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও কবরস্থান। চারটি দোকান ও একটি কাঁচাবাজারও থাকবে স্বপ্নের ঠিকানায়। আবাসন প্রকল্পটির ভেতরে ২ দশমিক ২৫ কিলোমিটার রাস্তা ও সাড়ে চার কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।

জানা যায়, প্রকল্পের বাড়িগুলো ৯৯ বছরের ইজারা হিসেবে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে দেওয়া হচ্ছে। বাড়িগুলোর অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণ, বিল ও ট্যাক্স বাড়ির মালিকরা বহন করবেন। কিন্তু বাইরের যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তাঘাট ইত্যাদির ব্যয় বহন করবে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আগে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন জাকির হোসেন। জমি অধিগ্রহণের ফলে প্রাপ্ত টাকায় এখন ব্যবসা করছেন। স্বপ্নের ঠিকানায় নতুন বাড়ি পেয়ে খুশি তিনি। কালের কণ্ঠকে জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এখানে। যখন বাড়িটা চলে গেল তখন মন খারাপ হয়েছিল। এখন স্বপ্নের ঠিকানায় বাড়ি পেতে যাচ্ছি ভেবে আনন্দ হচ্ছে। এখানে বেশ ভালোভাবে একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। স্কুল, মসজিদ, ক্লিনিক, রাস্তাঘাট সুন্দরভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।’

দাশের হাওলা গ্রামে বাড়ি ছিল মাহফুজা বেগমের। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো বাড়িটা চলে গেছে ভেবে খারাপ লাগে। তবে বাচ্চাদের শিক্ষা-দীক্ষার ভালো ব্যবস্থা হবে, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে—এসব দেখে ভালোই লাগছে।’

স্বপ্নের ঠিকানায় পুনর্বাসিত ওলিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের জন্য নিজেদের ক্ষতি মেনে নিয়েছি। আমরা যে জমির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম, সেই জমিই হারিয়েছি। তার পরও খুশি যে এলাকার উন্নয়ন হচ্ছে। তবে আরো খুশি হব যদি আমাদের প্রতিটি ঘর থেকে একজন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।’

মধুপাড়া গ্রামে পাঁচ বিঘা জমির বিশাল বাড়ি ছিল রাজা মিয়ার। ক্ষতিপূরণ ছাড়াও এখন স্বপ্নের ঠিকানায় পাচ্ছেন ৮ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মিত একটি সেমিপাকা বাড়ি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়ি পেয়ে খুশি। তবে অনেকেই নানা জটিলতায় এখনো জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি।’

নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খোরশেদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে।’ জমির ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সরকারি বিধি মোতাবেক সবাই ক্ষতিপূরণ পাবে।’

পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী পিনজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বপ্নের ঠিকানায় যে কারিগরি স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখান থেকে পুনর্বাসিত পরিবারের যেসব শিক্ষার্থী পাস করবে তাদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরি পাবে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ