প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত ১, গুলিবিদ্ধ ৯

কালের কন্ঠ : রাজধানীর পোস্তগোলায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু টোলমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনরত ট্রাকচালক-শ্রমিকদের সংঘর্ষে গুলিতে এক শ্রমিক নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে ৯ জন। গতকাল শুক্রবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মো. সোহেল (৩০) ট্রাকচালকের সহকারী ছিলেন। তিনি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার গুলগুলিয়ার চর এলাকার মফিজ উদ্দিনের ছেলে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন সোহেল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পুলিশের গুলিতে সোহেল মারা গেছেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তাদের গুলিতে কেউ মারা যায়নি। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের ইকুরিয়া এলাকায় অবস্থান নেয় ট্রাকচালক ও শ্রমিকরা। তারা ট্রাক রেখে সেতুর মুখে বাধা সৃষ্টি করে। এতে সেতুর দুই পারে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এভাবে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে। এরপর সকাল সোয়া ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ এসে সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশের দিকে ইট-পাথর ছুড়তে থাকে। এর পরই দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাস শেল ছুড়তে থাকে।

সংঘর্ষের সময় সড়কের পাশে থাকা কয়েকটি প্রাইভেট কার এবং পুলিশের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পুলিশের ছোড়া গুলিতে পথচারী, শ্রমিক, গার্মেন্টকর্মীসহ আরো অনেকে আহত হয়। এ সময় সেতুর দুই পারে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহেলসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। সোহেলকে স্থানীয় ইকুরিয়া জেনারেল হাসাপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইকুরিয়া জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপক কারিমুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, সোহেলের বুকের মাঝখানে ও পেটে গুলি লেগেছে। তিনি মারা যাওয়ার পরপরই পুলিশ এসে তাঁর লাশ নিয়ে যায়।

গুলিবিদ্ধ ৯ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে আছেন পেটে গুলিবিদ্ধ আল আমিন (২০), বাঁ হাতে গুলিবিদ্ধ সিদ্দিক (৪০), মাথায় গুলিবিদ্ধ সবুজ (৩০), মাথায় গুলিবিদ্ধ লিটন (৩৯), পিঠে গুলিবিদ্ধ বিল্লাল (২৩) ও মানিক (৪০)। বাকি তিনজনের পরিচয় জানা যায়নি।

এ ছাড়া পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়েছেন ট্রাকচালক আকাশ (২৫) ও হেলপার মাসুদ (৩২)। এ ঘটনায় বাক্প্রতিবন্ধী এক শ্রমিকও আহত হয়েছে।

আন্দোলনরত শাওন নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পুলিশ এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ আমাদের ওপর গুলি ছুড়তে থাকে। এতে ট্রাকচালকের সহকারী সোহেল নিহত হন। আহত হয় অনেকেই।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ শাহজামান বলেন, সংঘর্ষের সময় পুলিশের অন্তত ৫০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

এই শ্রমিক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন কি না জানতে চাইলে ওসি অস্বীকার করে বলেন, পুলিশ সেখানে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করেছে।

সোহেলের শ্যালক তানজিল জানান, সকালে তাঁর দুলাভাই নাশতা খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। পুলিশের গুলিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

পরিবারের লোকজন জানায়, সোহেল আগে পোস্তগোলায় একটি মুদি দোকানে কাজ করতেন। কোরবানির ঈদের পর তিনি ট্রাকে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, ওই শ্রমিক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন, না অন্য কারো গুলিতে মারা গেছেন, সেটা তদন্ত করা হচ্ছে। সংঘর্ষে পুলিশের অনেক সদস্যও আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ। দ্রুতই টোল সমস্যার সমাধান করবেন এবং সে পর্যন্ত টোল আদায় বন্ধ থাকবে বলে তিনি শ্রমিকদের আশ্বাস দেন। তাঁর এ আশ্বাসে আন্দোলনকারীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত করে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, আগে টোল ছিল বড় গাড়ি ২৫ টাকা, এখন সেটা ২৫০ টাকা করা হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা টোলমুক্ত ছিল, এখন ২৫ টাকা টোল নেওয়া হচ্ছে। এটা অস্বাভাবিকই বটে। একজন অটোরিকশাচালক এক ট্রিপে ৫০ টাকা ভাড়া পায়। সে যদি ২৫ টাকা টোল দিয়ে দেয়, বাকি ২৫ টাকা থেকে সে জমা দেবে কী, খাবে কী।

যে কারণে ঘটনা : পুলিশ, ট্রাকচালক, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুটি গত ২১ অক্টোবর এ আলম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইজারা নেয়। পরের দিন ২২ অক্টোবর টোলমুক্ত যাতায়াতের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করে অটোরিকশাচালকরা। দাবি মেনে নিয়ে ইজারাদার গত মঙ্গলবার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য সেতুটি টোলমুক্ত করে দেয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার থেকে সেতু পারাপারে টোলমুক্ত করতে দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করে ট্রাকচালক ও শ্রমিকরা।

ট্রাকচালক ও শ্রমিকরা জানায়, আগে ৩৫ টাকা করে টোল দিতে হতো। নতুন ইজারাদার সেটা বাড়িয়ে ২৪০ টাকা করেছে।

টোলমুক্ত আন্দোলন কমিটি ও ঢাকা জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি এমদাদুল হক দাদন বলেন, কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন যানবাহন থেকে যে হারে সেতুর টোল আদায় করা হচ্ছিল, গত মঙ্গলবার থেকে হঠাৎ করে সেই টোলের হার কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় ইজারাদার কর্তৃপক্ষ।

তবে সরকারি নিয়ম মেনেই টোল আদায় করা হচ্ছে জানিয়ে ইজারাদার এ আলম এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মো. আলম বলেন, ‘টাকা দিয়ে সেতু ইজারা নিয়েছি। টোলমুক্ত করার দাবি অযৌক্তিক।’

শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার মতো নয় জানিয়ে আলম বলেন, এত দিন সড়ক ও জনপথ বিভাগ নিজেরাই সেতুর টোল আদায় করত। সরকারের কাছ থেকে গত মঙ্গলবার তাঁরা সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব বুঝে নেন এবং সরকার নির্ধারিত হারে টোল আদায় করছেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তো টোল বৃদ্ধি করিনি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ যে হার নির্ধারণ করে দিয়েছে, আমরা সেই হারেই টোল আদায় করছি।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ