প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হেদায়াত পেতে হলে চাইতে হয়

সাইয়েদ রাশীদুল হাসান জাহাঙ্গীর : হেদায়াত সম্পর্কে শুরুতেই কিছুটা ধারণা থাকা চাই, যেটুকু জানা থাকলে আলোচনার সার বিষয়টি মর্মগত করা সহজ হবে। হেদায়াত হচ্ছে লক্ষ্যপানে প্রদর্শিত নির্ভুল পথ। ইমাম রাগেব ইস্পাহানি ‘মুফরাদাতুল কোরআনে’ হেদায়াতের মর্ম সম্পর্কে বলেছেন, ‘কাউকে গন্তব্যস্থানের দিকে অনুগ্রহের সঙ্গে পথ প্রদর্শন করা।’ তাই প্রকৃত অর্থে হেদায়াত করা আল্লাহরই কাজ। তবে আল্লাহর কাছে চাইলেই আল্লাহ হেদায়াত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আল্লাহ চান বান্দা হেদায়াত চাক তাঁর কাছে, তাই আল্লাহ হেদায়াতের দোয়া শিখিয়েছেন এবং তাঁর সামনে সালাতে দাঁড়িয়ে ঈমানদার মুসলিমরা সুরা ফাতিহায় শেখানো হেদায়াত লাভের দোয়াটি করেই চলছে প্রতিদিন অন্তত সতেরো বার। হেদায়াত ব্যাপকভাবে জাগতিক ও পরজাগতিক লক্ষ্য হাসিলের এবং সৃষ্টিজগতের সব সৃষ্টির লক্ষ্যে পৌঁছার পথ। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে জ্ঞাতব্য যে, হেদায়াত দৃশ্যত জীব ও জড় সব ধরনের ব্যক্তি-বস্তুর জন্যে সাধারণভাবে উন্মুক্ত। মানুষ হিসেবে মুসলিম অমুসলিম সবার জন্যই সমানভাবে আল্লাহর হেদায়াত প্রযোজ্য। মুত্তাকি হওয়ার শর্ত এখানে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু যে হেদায়াত বা সঠিক ও সরল পথের মাধ্যমে জান্নাত লাভ করা হবে, সে হেদায়াত লাভে তাকওয়ার শর্ত অবশ্য জরুরি।

আমাদের অনেকেই বলে থাকেন হেদায়াত আল্লাহর হাতে। আল্লাহ যদি কাউকে হেদায়াত না দেন, সে কখনো হেদায়াত লাভ করতে পারে না। একথা বলে যারা হেদায়াতের পথে চলতে চায় না, চলতে চায় না আলোর পথে, তারা নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টাই শুধু করে। তারা বলে, হেদায়াত তো আল্লাহর হাতে। আল্লাহ হেদায়াত না দিলে হেদায়াতের পথে চলি কীভাবে? আল্লাহ হেদায়াত দিচ্ছেন না বলেই তো চলছি এভাবে। আসল কথা হলো, কেউ যদি হেদায়াত লাভের ইচ্ছে না করে, আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়াত গ্রহণের সিদ্ধান্ত না নেয়, সারা দুনিয়ার মানুষ একযোগে তাকে নসিহত করলে, সব ধর্মগ্রন্থ তার মাথায় উঠিয়ে দিলেও সে কখনো ধার্মিক হতে পারবে না।

আবার অনেকে বলেন, ‘আল্লাহই তো মোহর মেরে দিয়েছেন, যার জন্য অন্তর অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, বধির হয়ে গেছে, দৃষ্টি মূর্খতায় আচ্ছাদিত হয়েছে। তাহলে কীভাবে একজন মানুষ হেদায়াত লাভ করতে পারে? পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, কানকে করেছেন বধির আর চোখ ঢেকে দিয়েছেন পর্দায়। ওদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।’ (সুরা বাকারা : ৭) এখানে আল্লাহ একটি চিরায়ত সত্য প্রকাশ করেছেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান ও নিওরোসায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় : সত্য অনুসন্ধানে সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ না করে কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও অবিদ্যা দ্বারা ক্রমাগত প্রভাবিত হতে থাকলে মানুষের মস্তিষ্কের ওয়ার্কিংস্ট্রাকচার বা কর্মকাঠামো বদলে যায়। ফলে তার সত্যবাণী শোনার আগ্রহ ও সামর্থ্য দুই-ই হ্রাস পায়। ক্রমান্বয়ে অন্তর বিভ্রান্তির আস্তরে স্থায়ীভাবে আচ্ছাদিত হয়। এ মোহর লাগা ও কঠিন শাস্তি কোনো অলঙ্ঘনীয় নিয়তি নয়; বরং প্রাকৃতিক আইন অনুসারে ব্যক্তির স্বাধীন পছন্দ ও কর্মের পরিণতি। একইভাবে বিশ্বাস স্থাপন ও সৎকর্মের পুরস্কারও হচ্ছে ব্যক্তির সহজাত বিচারবুদ্ধির স্বাধীন ও সঠিক প্রয়োগের সুফল।’ তাহলে এখানে আল্লাহর বা কোনো ব্যক্তির ঘাড়ে দায় চাপিয়ে বেঁচে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আল্লাহপাক বান্দাদের আরো শিখিয়ে দিয়েছেন, পবিত্র কোরআনে তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘জ্ঞানীরা বলে, হে আমাদের প্রভু! আলোর সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে (সব ধরনের সংশয় ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত রেখো, আর কখনো) ভুল পথে বাঁকিয়ে দিও না।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত : ৮) তাহলে আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলাম, সিরাতুল মুস্তাকিম বা আলোর সরল পথ পেতে হলে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, তেমনি সে পথে টিকে থাকতেও আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করুন। আমিন!

লেখক : ইসলামিক চিন্তাবিদ ও খতিব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ