প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না

মানবজমিন : নাবিলা। বয়স এক বছর। আধো আধো কথা ফুটছিল। হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখতো ঘর। তাকে ঘিরেই পরিবারের সদস্যদের আনন্দের ভাগাভাগি। গত রোববার রাতে বেপরোয়া পিকআপের ধাক্কায় রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে নাবিলা এখন না ফেরার দেশে। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ পরিবার। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মা, ভাই, বোন ও মামার সঙ্গে নাবিলা গিয়েছিল রাজধানীর নিউ মার্কেটে।

রিকশায় মায়ের কোলে বসে আদাবরের বাসায় ফিরছিল। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে তাদের বহনকারী রিকশাটি মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালের সামনে পৌঁছে। ঠিক তখনই বেপরোয়া গতির একটি পিকআপ ভ্যান তাদের রিকশাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে নাবিলা। সঙ্গে তার মা-ও ছিটকে পড়েন মাটিতে। নাবিলার মা হাত-পায়ে আঘাত পেলেও নাবিলাকে বাঁচানো যায়নি। ওই রিকশার চাকা চলে যায় নাবিলার মাথার ওপর দিয়ে। এতে করে মাথা ফেটে গুরুতর আহত হয় ছোট্ট নাবিলা। তাকে উদ্ধার করে পাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরদিন সোমবার। দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে রাস্তা পার হওয়ার সময় দু’বাসের মাঝে চাপা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, মো. সেলিম (২২) ও জুয়েল (৩০)। সেলিমের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার আলেপুরে। ডেমরায় পরিবার নিয়ে থাকতেন তিনি। সেলিমের মা মনোয়ারা বেগম গণমাধ্যমকে জানান, যাত্রাবাড়ীতে একটি খেলনার কারখানায় কাজ করতেন সেলিম। নিহত জুয়েলের বাড়ি বরিশালে। তিনি দয়াগঞ্জ বটতলা মোড় হিজড়ার বাড়ির ২য় তলায় থাকতেন। তুরাগ পরিবহনের গাড়ি চালক তিনি। বেলা ১টার দিকে ডেমরা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যাত্রাবাড়ী আসেন সেলিম। তাঁর সঙ্গে একই অটোরিকশায় ভাগাভাগি করে আসেন জুয়েল। সিএনজি থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার সময় দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন তারা। স্থানীয় লোকজন তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেলিমকে মৃত ঘোষণা করেন। জুয়েলকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বিকাল পাঁচটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জুয়েলও।

একই দিন বিকালে সাদ্দাম মার্কেটের সামনে মোর্শেদা বেগম (৫০) বাসের ধাক্কায় মারা যান। দুর্ঘটনায় আহত হয় মোর্শেদা বেগমের সঙ্গে থাকা নাতনি তাসফিয়া (৮)। তারা বাড়ি যাচ্ছিলেন। সাদ্দাম মার্কেট থেকে বাস স্টেশনে যাওয়ার জন্য সড়ক পার হচ্ছিলেন। এমন সময় একটি বাস তার মা ও ভাতিজিকে ধাক্কা দেয়। তাদের ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেয়া হলে সন্ধ্যায় তার মাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

গত শনিবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেতে বাসের ধাক্কায় নিহত হন আবদুস সালাম (৬৮)।
সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রের গবেষণায় বলা হয়েছে গত ৬০৬ দিনে এ নিয়ে ৫,৩৮৫ জন নিহত হয়েছে। রোববারই নিহত হয়েছে ৭ জন। এদিকে দুই বছরের মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। সোমবার দুপুরে নগর ভবনে ‘নিরাপদ সড়ক দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা উদ্বোধনের সময় এ কথা বলেন তিনি।

সাঈদ খোকন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে সড়কে নিরাপত্তা বাড়াতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে রাজধানীর সব বাসগুলোকে শিগগিরই নির্দিষ্ট কোম্পানির আওতায় আনাসহ লেগুনা চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আনা হবে।

এ বিষয়ে বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ডিপার্টমেন্টের (এআরআই) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার মানবজমিনকে বলেন, একটি বিষয় যখন শুরু হয় সেটা বন্ধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। চাইলেই একদিনের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। এটা বন্ধ করার জন্য সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। কেউ যদি দায়িত্বে অবহেলা করে তার কঠোর শাস্তি হবে এরকম স্ট্রং জবাবদিহিতা থাকা চাই।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, গত দুই বছর ধরে সরকারিভাবে নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সে উদ্যোগগুলোর কার্যক্রম যখন শুরু হবে তখন হয়তো সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কমতে পারে। সত্যি বলতে কী ৯০ ভাগ মানুষ আইন মানে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, সড়ক নিরাপদ করতে গেলে যে বিষয়গুলোকে আমাদের মানতে হবে তা সরকার কতটা মানতে বা মানাতে পারবে সেটাও একটি বিষয়। ঢাকা এবং তার আশেপাশে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে হাইওয়েতে বেশি ঘটে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে দেশে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা বলতে আসলে কিছুই নেই। কারণ অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে স্বাগতম জানিয়ে কখনোই এটাকে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থাপনা করা যাবে না। ঢাকার চিত্রটা যদি দেখি এখানে জনসংখ্যার অধিক ঘনত্ব। জনসংখ্যার ঘনত্ব এত বেশি যে চাইলেই শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। প্রথমত নাগরিকদের চলাচলের যে দায়িত্ব এগুলো আমরা শিখিনি। দ্বিতীয়ত যে সমস্ত পরিবহন এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় আনতে পারছি না। ফলে অনেকেই মনে করে আমি অপরাধ করলে বা আমার পরিবহনের চালক অপরাধ করলে কোনো না কোনো ভাবে পার পাওয়া যাবে। সেটা রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে হোক, অর্থ দিয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে।