প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেষ লড়াইয়ের প্রতীক্ষা

মানবজমিন : রাজশাহী-২ আসনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রেশ এখনো কাটে নি। এরই মাঝে দরজায় কড়া নাড়ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় ৮৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে মেয়র পদে বিজয় ছিনিয়ে আনা আওয়ামী লীগের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এককভাবে সাবেক এমপি তিনবারের মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর অবস্থান শক্ত। উত্তাপ থাকলেও সিটি নির্বাচনের প্রচারণা ও অভিজ্ঞতা ভালোমতো কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। রাজশাহী সদরের এ আসনটি দীর্ঘদিন বিএনপি ও বর্তমান সরকারের মেয়াদে ওয়ার্কার্স পার্টির দখলে। তাই এবার নৌকার পতাকা উড়াতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থী। ইতিমধ্যে ভোটের মাঠে তারা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।

মনোনয়ন দৌড়ে মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের নাম যেমন আছে, তেমনি সামাজিকভাবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শাহীন আকতার রেনীর নামও এসেছে। জাতীয় চারনেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান পরিবারের সদস্য ও রাসিক মেয়রের সহধর্মিণী হিসেবে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা দৌড়ে মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আহসানুল হক পিন্টু ও মহানগর ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতি জয় পরিষদ আহ্বায়ক শফিকুজ্জামান শফিকের নাম শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ বজলুর রহমানও মনোনয়ন চাইতে পারেন। তিনি বর্তমানে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। ’১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডে তাকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৪ দলের শরিক হিসেবে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা মনোনয়ন পান। এর আগে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রাক্তন রাবি ভিসি অধ্যাপক আব্দুল খালেককে প্রার্থী করা হলেও পরে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশার নাম ঘোষণা করা হয়।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার মানবজমিনকে বলেন, ‘দু’বার ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি আছেন। উন্নয়মূলক কাজে দলীয় নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় নি। অথচ আওয়ামী লীগের ভোট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সিটি নির্বাচনে তার প্রমাণ মিলেছে। তৃণমূলের কর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রার্থী চাচ্ছে এই ভোটকে কাজে লাগাতে। আর সদর আসনেও আওয়ামী লীগের এমপি থাকলে অনেক বেশি কাজ করা সম্ভব। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত যা আসুক তা মাথা পেতে নেবেন বলে জানান এই আওয়ামী লীগ নেতা।

মহানগর ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রফিকুল ইসলাম সেন্টু বলেন, ‘সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা তৃণমূলের কাছে যেমন আস্থার প্রতীক। তেমনভাবে সাধারণের কাছে সমান জনপ্রিয়। সিটি নির্বাচন শুরুর অনেক আগে থেকে মহানগর ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতি শফিকুজ্জামান শফিক সাবেক ছাত্রলীগ ফোরামের আহ্বায়ক হিসেবে পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের এক কাতারে আনেন। তার সেই প্রচারণায় জনগণের ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। যারা একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন, অনেকে আওয়ামী লীগের, যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা শফিককে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছেন। আমরা চাই তৃণমূলের কর্মী থেকে উঠা আসা ভালো সংগঠককে মনোনয়ন দেয়া হোক। যারা শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবে এবং রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে। আমরা বিশ্বাস করি, এবারের প্রার্থী নির্ধারণে বঙ্গবন্ধুকন্যা পরিচ্ছন্ন তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেবেন।’ রাসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘আমরা কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি না, ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা পরিচ্ছন্ন-পরীক্ষিত নেতৃত্বকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই।’

মহানগর যুবলীগ সভপতি রমজান আলী বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে যুবলীগের শক্তিশালী ভূমিকা আছে। আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড, থানা ও মহানগর কমিটির অধিকাংশ নেতাকর্মীই যুবলীগের রাজনীতি থেকে ওঠে এসেছেন। তাদের দাবির কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। সেভাবে নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছি। জনগণের দৌরগোড়ায় নৌকা প্রতীকের উন্নয়ন, শেখ হাসিনার উন্নয়ন, লিটন ভাইয়ের উন্নয়ন তুলে ধরছি।

এ ছাড়া শরিক দলের জাসদ (বাদল-আম্বিয়া) জেলা সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ইকবাল বাদল এবং সাম্যবাদী দলের মাসুদ রানা সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
তবে মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামাণিক দেবু দাবি করেন, ২০০৮ সালে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার ভূমিকার কারণে তাকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে যেসব ভূমিকা রেখেছেন, অতীতে কোনো সংসদ সদস্য তা রাখতে পারেন নি। দৃশ্যমান উন্নয়নে রাজশাহীর অধিকারের দাবিগুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন। যা অত্র অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ফজলে হোসেন বাদশার ভূমিকা ছিল- দলীয় এমপি না, জনসাধারণের এমপির। তিনি আবারো ১৪ দলের প্রার্থী হবেন এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

এদিকে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে মিজানুর রহমান মিনুর নাম আসার অনেকগুলো কারণকে চিহ্নিত করেছেন নেতাকর্মীরা। তারা জানান, উন্নয়নের রূপকার হিসেবে মেয়র ও এমপি থাকাকালীন সময়ে টানা ১৭ বছরে আনাচে-কানাচে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং-বিআইটিকে পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহী প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-রুয়েট প্রতিষ্ঠা, মহিলা পলিটেকনিক, নগরভবন (১৯৯৯), দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন তৈরি (২০০৪), জনবান্ধব মেয়র হিসেবে কখনও সাধারণ জনগণ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন। হোল্ডিংট্যাক্স বারান নি, সহনীয় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০০২ সালে রাজশাহী মহানগরীকে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নিয়ে আনেন। সমাজে পতিতাদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৪৪ জন নেতাকর্মী নিয়োগ ভোটের মাঠে বরাবরই তাকে এগিয়ে রাখে।

জনপ্রিয় নেতা হিসেবে মেয়েরের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অফিস সময়ের (৯টা-৫টা) বাইরে সকাল ৭টা থেকে বাসায় নাগরিকদের সমস্যার কথা শুনতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। রিকশা নিয়ে বিকালে নগর পরিদর্শনে বের হতেন। বিভিন্ন পাড়া-মহাল্লা, ক্লাবে বসে জনসাধারণকে সময় দিতেন। তাকে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেও দেখেছেন অনেকে। এখনো সাধারণ মানুষের সঙ্গেই তার ওঠাবসা। এ ছাড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন দু’জনেই তার আশীর্বাদপুষ্ট। সদ্য সমাপ্ত সিটি নির্বাচনে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে তার নাম আসে। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মহানগর সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পক্ষে ভোটের লড়াইয়ে নামেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, পাড়া-মহাল্লায় গিয়ে যেভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন তাতে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিও অনেকটা সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোট চুরি রুখতে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে নেতাকর্মীরা সতর্ক আছেন।

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, সংসদ সদস্য ও তিন মেয়াদে ১৭ বছর মেয়র হিসাবে মিজানুর রহমান মিনু প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। আধুনিক রাজশাহীর রূপকার তিনি। বিগত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পুলিশ-প্রশাসনের দমনের ভেতরে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে অভিভাবকের ভূমিকায় নামেন। ভোটের আগের রাতে ও ভোটের দিন নেতাকর্মী, এমনকি ধানের শীষের ভোটারদেরকেও পুলিশ যেভাবে বাধা দিয়েছে রাজশাহীর মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা বিএনপির ধানের শীষকে ভালোবাসে, ধানের শীষের প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুকে ভালোবাসে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না। জনগণ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘দল-জোট সবাই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারে অধীন নির্বাচনের কথা বলেছি। সেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করতে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ