প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটা দুষ্টু হেডিং চাই, একটা টসটসে লাইন চাই !

সালেহ বিপ্লব : ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ আমি অনলাইন পোর্টাল পরিবর্তনে জয়েন করি বার্তা সম্পাদক হিসেবে। পরের মাসেই এলেক্সা র‌্যাংকিং-এ বিপ্লব ঘটে গেলো। ১৩ নাম্বার থেকে ১২ তে উত্তীর্ণ হল পরিবর্তনডটকম। আমার পদোন্নতি হল চিফ নিউজ এডিটর পদে।

সেই থেকে আমি অনলাইনের একনিষ্ঠ ছাত্র হলাম। ৫ বছর ধরে আমি অনলাইন পোর্টাল নিয়ে মেতে আছি। অনেক কিছু শিখেছি। এর মধ্যে সরকার অনলাইনের জন্য বিরাট সুযোগ করে দিলো। বাসায় একটা পিসি নিয়ে জামাইবউডটকম শুরু করলেন অনেকে। এরপর যা শুরু হয়ে গেলো, বলার মত না। যেমনটা হয়েছিলো, বিটিআরসি যখন কল সেন্টার শুরু করলো। টাকা আছে, ধূর্ত উপদেষ্টা আছে, এমন সব লোক কল সেন্টারের লাইসেন্স নিলো। এদের অনেকেই কম্পিউটারও চালাতে জানে না। ফলে কল সেন্টারের কাঙিক্ষত সূচনা বিলম্বিত হল।এটা জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলি রেগুলেটারি কমিশনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক।

তেমনি আওয়ামী লীগ যখন অনলাইন পোর্টালের দ্বার খুলে দিলো, প্রথম ধাক্কাতেই অদ্ভুত রকম অনলাইন চালু হতে লাগলো। তাদের দাপটে পেশাদার সাংবাদিকরা হিমসিম খেতে লাগলেন। জামাইবউ ডটকম, কথা বেশি কাজকম, কইয়া দিমু ডট কম এবং এই জাতের হাজার হাজার অনলাইন। অফিস নেই, ঘরে বসে চালায়। মেয়েদের বিশেষ ছবি আর যৌনগন্ধী নিউজ দিয়ে এরা হাজার হাজার লাইক জুটিয়ে ফেলতে লাগলো। ভুয়া লাইক তো কেনাই যায়। আর সবচেয়ে বিপদ হয়ে দাঁড়ালো এদের সংবাদের শিরোনাম।

মিথ্যা খবর, অখাদ্য নিউজ আর অশুদ্ধ লেখার চর্চা বাজারে বিক্রি করতে অশ্লীল শিরোনাম দিয়ে এরা একটা চরম অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো। অনলাইনের ধারাই যেমন এমন হয়ে গেলো। দু একটা বাদে আর সবার নিউজ এমন : নারীর চরম চাওয়া, বাসর রাতে কী করবেন এবং এর চেয়েও জঘন্য শিরোনাম। এসব নিয়ে অনেক অনলাইন কর্তার সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা সাংবাদিকতাই বোঝেন না, তো আমার কথাও বুঝলেন না। এরই মধ্যে আমি এক প্রতারকের খপ্পরে পড়লাম। প্রতারক বিরাট ব্যবসায়ী, তার অনলাইনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত তরুণ আমি সেই অফিসে একঝাঁক নতুন কর্মী পেলাম।

তারাও জানে হেডলাইনে চটকদার কথা আনতে হবে। কাহিনীতে রগরগে গল্প আনতে হবে। তখন আমি হাতে কলমে তাদের শেখালাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিরিয়াস রিপোর্টের শিরোনামেও চমক রাখা যায়। যে কোন ভালো স্টোরিতেই তা করা যায়। তাদের কীভাবে শিখিয়েছিলাম, একটা উদহারন দেই। একটা নিউজ হোয়াইট বোর্ডে লিখে দেখালাম। শিরোনাম, ‘পুরুষ কেন পারে না?’ অথবা ‘পুরুষ কেন অক্ষম?’ এবার নিউজ। ‘কিছু গান আছে, শুধু মেয়েদের জন্য লিখা। মনে আগুন জ্বলে, চোখে কেন জ্বলে না, হয়ত কিছুই নাহি পাব, তোমার আকাশ দুটি চোখে এবং এরকম আরও কিছু। কোন পরুষ শিল্পী এসব গান করেন না, অন্তত গানের সিরিয়াস শ্রোতা হিসেবে আমি এটা জানি।

পুরুষরা এসব গান কেন গান না? প্রথমত লিরিক মেয়েদের জন্যই। আর প্রধানত স্কেল। সন্ধ্যা কিংবা লতাজির স্কেলে গান গাইলে পুরুষের কণ্ঠ শেষ হয়ে যাবে। ভোকাল কর্ডের গঠন এখানে মূল কারণ। ভোকাল কর্ডের তারতম্যের কারণে পুরুষরা কিছু গান গাইতে পারেন না’। রিপোর্ট শেষ। একশ ভাগ মানসম্পন্ন রিপোর্ট। শিরোনাম যা দিলাম, তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে হাজার পাঠক। এটা আমি প্রমাণ করেও দেখিয়েছি। এতো গেল শিরোনাম।

এবার আসুন, সুড়সুড়ি দেয়া রিপোর্ট সম্পর্কে আলাপ করি। একশ ভাগ মানসম্পন্ন রিপোর্ট দিয়েও সুড়সুড়ি দেয়া যায়। অশ্লীলতা দরকার হয় না। উদহারন দেই আরেকটা। তখন আমি পরিবর্তনে। আমি বিবিসি’র খুব ভক্ত। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, বিবিসি বাংলা কিন্তু নয়। ইংরেজিটা। আমার পিসিতে বিবিসি খোলা থাকবেই। তো একদিন বিবিসির সর্বাধিক পঠিত তালিকায় চোখ গেলো। দেখি, ভারতের একটা হেলথ বিষয়ক রিপোর্ট। কয়েক বছর আগের। সেটাই আবার সর্বাধিক পঠিত তালিকায় উঠে এসেছে। মাথায় দুষ্টুমি চাপলো। তখন ড্যাফোডিল ইউনিভারসিটির একটা টিম আমার সাথে ইন্টার্নি করছে। তাদের শেখানোর জন্য এবং অনলাইনের বার্তা সম্পাদকদের ছবক দেয়ার জন্য আমি স্টোরিটা অনুবাদ করলাম।

রিপোর্টেরর সারমর্ম বলি। বিবিসির দিল্লী প্রতিনিধির রিপোর্ট। ভারতে অনাকংখিত প্রেগনেন্সি বাড়ছে, বাড়ছে এবরশন। জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প জোরদার হওয়া সত্ত্বেও ভারতের নারীরা ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভবতী হচ্ছে। এটা সরকারের নজরে এসেছে। নামীদামী একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এর কারণ বের করার দায়িত্ব দেয়া হলো। এই বিজ্ঞানী ও গবেষকরা দীর্ঘ জরিপ চালিয়ে দেখলেন, মূল সমস্যা কনডমে। বাজারে যে কনডম পাওয়া যায়, তা আন্তর্জাতিক মান ও মাপের। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাপের কনডম ভারতীয় পুরুষদের ফিট করে না। ঢোলা হয়। ফলে হঠাৎ খুলে যায়। কখনো কখনো ভেতরে থাকা অবস্থায় ফুটে যায়। ফলে সঙ্গিনী প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে।

ভারতীয় সরকারি রিসার্চ সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারকে বলা হল, আন্তর্জাতিক মাপের কনডম আর ব্যবহার করা যাবে না। ভারতীয় পরুষদের জননাঙ্গের যেই সাইজ, সেই সাইজের কনডম বানাতে হবে।’ এই অসাধারণ হার্ড রিপোর্ট কি ওইসব যৌনগন্ধী লেখার চেয়ে কম আবেদনপূর্ণ? ভেবে দেখুন অনলাইন পোর্টালের কর্তাব্যক্তিরা। আপনাদের সুমতি হলে অনলাইন পোর্টালের ইমেজ তরতর করে বাড়বে। আবার আপনারা পুলকিত হওয়ার সুযোগও কিন্তু পাবেন।

লেখক : সিনিয়র নিউজ এডিটর, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ